‘এখন আমাদের কোনো অভাব নেই। পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোই কাটছে দিন। কিন্তু মাতৃস্নেহের জন্য বুকটা ফেটে যায়’। কথাগুলো বলতে গিয়েই কেঁদে ফেলেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত রেজিয়া বেগমের ছোট ছেলে নূরনবী মোস্তুল্লা। বর্বরোচিত সেই ২১ আগস্টের হামলার রক্তাক্ত ছবি দেখলেই আজও নূর-নবীর মতো আঁতকে উঠেন অন্য স্বজনরাও। ১২ বছরেও বিচার না হওয়ায় রেজিয়ার দুই সন্তানসহ পরিবারের অন্যান্যরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। শুক্রবার বিকেলে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গঙ্গানারায়ন গ্রামে নিহত রেজিয়া বেগমের বাড়িতে গেলে কথা হয় নূর-নবীসহ অন্য স্বজনদের সঙ্গে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে নূর-নবী জাগো নিউজকে জানান, মায়ের মৃত্যুর কয়েক বছর আগে থেকেই শয্যাশয়ী ছিলেন নানা আফাজ উদ্দিন। মেয়ের মৃত্যুতে তিনি আরো ভেঙে পড়েন। ছবি বুকে নিয়ে শুধুই কাঁদেন আর কাঁদেন। মানুষ দেখলেই জানতে চাইতেন কবে মেয়ে হত্যার বিচার হবে। মেয়ে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি তিনি। গত বছরের ২৯ জুন না ফেরার দেশে চলে যান নানা আফাজ উদ্দিন।রেজিয়া বেগমের বড় ছেলে হারুন-উর -রশীদ জাগো নিউজকে জানান, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসে ভিসায় ছবি লাগানোর কাজ করতেন তাদের মা। থাকতেন হাজারী বাগ এলাকায়। ওই এলাকার আওয়ামী লীগের নেত্রী আয়শা মোকাররমের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তাদের মা। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঢাকায় আ.লীগের মিছিল মিটিংয়ে রেজিয়া বেগমের সরব উপস্থিতি ছিল।২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার জনসভায় আয়শা মোকাররমসহ আরো ২০ জন আ.লীগ কর্মী মিছিল নিয়ে যোগ দেন। জনসভা চলাকালীন হঠাৎ ভয়াবহ গ্রেনেড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকা। ঘটনাস্থলেই মারা যান মা রেজিয়া বেগমসহ ২৪ জন। পরদিন ২২ আগস্ট নানা আফাজ উদ্দিন ঢাকায় গিয়ে তাদের মায়ের মরদেহ সনাক্ত করেন। পরে তাকে ঢাকা আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।নূর নবী প্রশ্ন রেখে বলেন, মায়ের হত্যাকারীদের বিচারের জন্য আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে আমাদের? এই সরকারের আমলে যদি ঘাতকদের বিচার না হয় তাহলে কি আমরা আদৌ বিচার পাব! পেশায় পান দোকানি নূর নবী বলেন, ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের ৮ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। এর আগে দিয়েছিলেন ১ লাখ টাকা। এখন আমাদের কোনো অভাব নেই। পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোই কাটছে দিন। কিন্তু মাতৃস্নেহের জন্য বুকটা ফেটে যায়। নূর নবী বলেন, ১২ বছর থেকে মায়ের হত্যাকারীদের বিচারের আশায় দিন গুণছি। তারা পুরো পরিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি এ সরকারের আমলেই বিচার দাবি করে বলেন, বিচার হলেই তার মায়ের আত্মা শান্তি পাবে।বড় ছেলে হারুন-উর-রশিদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার গদিত বসার পর হামরা মনে করছি এইবার মার হত্যার বিচার পামো। কিন্তু ১২ বছর পার হইল এ্যালাও তো বিচার পাইনো না। হামার নানা আফাজ উদ্দিন বেটি হত্যার বিচার দেখি যাবার পাইল না। ব্যাচারা মরি গেইল’। রেজিয়ার ছোট বোন আনোয়ারা বেগম জাগো নিউজকে বলেন,‘প্রতি বছর ২১ আগস্টের ঘটনাগুলা টেলিভিশনত দেখি আর কাঁন্দি’। হামরা শুনছি দ্যাশ স্বাধীন হওয়ার ৩৯ বছর নাগছে আজাকারদের (রাজাকার) বিচারের জন্য, বিচার নাকি এ্যালাও হওছে। শেক সাহেবেরও বিচারের জন্যে নাকি ৩৪ বছর নাগছে’। হামার বোইনের হত্যাকারীর বিচারের জন্যে যে কতকাল অপেক্ষা করা নাগে তা আল্লাই জানে’। রেজিয়া বেগমের পরিবারের বিষয়ে জানতে চাইলে বালাপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আনছার আলী জাগো নিউজকে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই পরিবারটির উপর সব সময় সদয় দৃষ্টি রেখে চলেছেন। সাহায্য সহযোগিতা দিয়েই যাচ্ছেন। আমরা দলের পক্ষ থেকে পরিবারটির খোঁজ খবর রাখছি। এ ধারা চলমান থাকবে। রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ১৫ আগস্টের বর্বরতা ঘটেছিল জনগণের চোখের আড়ালে, রাতের অন্ধকারে। কিন্তু ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা হয়েছে প্রকাশ্যে দিবালোকে। বাংলাদেশের কোনো জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী ও অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের মূল নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার চেষ্টা ইতিহাসে বিরল। খুব দ্রুত ২১ আগস্টের ঘাতকদের বিচার নিষ্পত্তির দাবি জানান তিনি।এসএস/পিআর