বড় দিনের উৎসবকে ঘিরে দেশের সর্বত্র চলছে উৎসবের আমেজ। গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী খ্রীস্টান ধর্মালম্বীরা দিনটিকে পালন করছেন নানা আয়োজনে। কিন্তু ভিন্ন চিত্র বিরাজ করছে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার সাঁওতাল পল্লীতে। ভূমি অধিকার ও বাপ-দাদার ভিটে আকড়ে ধরে থাকতে গিয়ে গত ৬ নভেম্বর হামলার শিকার প্রায় তিন শতাধিক খ্রীস্টান ধর্মালম্বী সাঁওতাল পরিবারে বড়দিনের উৎসবের ছোঁয়া লাগেনি। বড়দিনের উৎসব নিয়ে সাঁওতাল পল্লীতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের মধ্যে নেই কোনো আয়োজন। ফলে এখানে আশ্রয় নেওয়া সাঁওতালদের মধ্যে নেই কোনো ধরনের উচ্ছ্বাস আর আনন্দ। তাদের কাছে এ বছরের বড়দিনের উৎসব যেন স্বাভাবিক একটি দিন। বড়দিন উপলক্ষে সাঁওতাল পল্লীতে আশ্রয় নেওয়া নারী-পুরুষের নেই নতুন কাপড়, শিশুদের জন্য নেই কোনো উপহার। এছাড়া এ দিনে বাড়িতে মেয়ে-জামাইসহ কোনো আত্মীয়-স্বজনদের বেড়ানোর বিষয়টিও অনিশ্চিত। কারণ দারিদ্রতার করাল গ্রাসে উচ্ছেদ আতঙ্ক ও হুমকির মুখে রয়েছে তাদের নিত্যদিনের জীবন। সেই সঙ্গে নিজের জীবনের নিরাপত্তাহীনতা আর নানা ধরণের শঙ্কায় দিনাতিপাত করছেন তারা। গত ৬ নভেম্বর পুলিশ প্রশাসন, মিল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর ও জয়পুর পাড়ার সাঁওতাল পল্লীতে হামলা, আগুন ও গুলি চালিয়ে উচ্ছেদ করে। এতে তিন সাঁওতাল নিহত ও আহত হয় অনেকে। এরপর থেকে এসব পরিবার মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার গীর্জার সামনে, পরিত্যক্ত স্কুল মাঠ ও খোলা আকাশের নিচে তাবুতে খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হয়ে এখানে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে এক মুঠো ভাত ও বাপ-দাদার জমি ফিরে ফেতে যুদ্ধ করছে এ জনগোষ্ঠী। গীর্জার সামনে ত্রিপলের (তাবু) নিচে আশ্রয় নেওয়া টাটু টুডু বলেন, ৬ নভেম্বর হামলার পর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছি। নানা ধরনের হুমকির কারণে বাইরে গিয়ে কাজকর্ম করতে পারি না। এনজিও ও বিভিন্ন সংগঠন যে ত্রাণ দিয়েছে তা খেয়ে চলছে দিন। ভয় আর জীবনের নিরাপত্তহীনতায় ভোগার কারণে এ বছর বড়দিনের উৎসবের আমেজ নেই সাঁওতাল পল্লীতে। নেই কোনো কেনাকাটা, নেই কোনো বিশেষ আয়োজন। বার্নাবাস বলেন, হাতে কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই, জীবন নিয়ে আতঙ্ক যেখানে, সেখানে আবার কিসের উৎসব। প্রতিবছর বড়দিনে আনন্দ-ফুর্তি হতো। বাড়িতে মেয়ে-জামাই ও মেহমান আসতো। কিন্তু সেই আনন্দ এবার নেই। সবকিছু ৬ নভেম্বরের হামলায় বিলিন হয়েছে। অনতুলি হেমরম জানান, প্রতিবছর বড়দিন আসলে তারা দিনটাকে আনন্দ আর উৎসবে পালন করেন। পাড়ায় পাড়ায় নানা অনুষ্ঠানের আয়েজন করতেন। ঘরের ছেলে-মেয়েরা সরাদিন এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিত। কিন্তু ভয় ও আতঙ্কে এবারের বড়দিনে এসব করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এখানে আশ্রয় নেওয়া সাঁওতালদের অনেকে জানান, বড়দিন উপলক্ষে শুধুমাত্র মাদারপুর গীর্জায় প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে বড়দিনের উৎসব পালিত হবে। গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত কুমার জানান, মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার সাঁওতাল পল্লীতে বড়দিনের উৎসব যাতে নিবিঘ্নে হয় সেজন্য পুলিশ প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে। এফএ/এমএস