বরগুনায় স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে মাসুম বিল্লাহ নামে এক ভুয়া ডাক্তারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে মাসুম বিল্লাহ নিজেকে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বলে পরিচয় দিয়ে বরগুনা শহরে চিকিৎসা বাণিজ্য চালিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত এক বছর ধরে বরগুনা শহরের একটি ভাড়া বাসায় তালাবন্দি করে গোপনে স্ত্রীকে নির্মম নির্যাতন করে আসছিলেন তিনি। রোববার বিকেলে বাড়ির মালিক পক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে বরগুনার বাজার সড়কের পাঁচতলা ভবন ‘গোলাপ প্লাজা’র একটি ফ্ল্যাট থেকে তাকে গ্রেফতার করে বরগুনা থানার পুলিশ।
নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ কানিজ ফাতিমা সোনিয়া (২২) জানান, দীর্ঘ এক বছর ধরে তাকে একটি ফ্ল্যাটে তালাবদ্ধ রেখে নির্মম নির্যাতন করে আসছিল মাসুম বিল্লাহ। তিনি একজন শিশু বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে আজ থেকে ১৪ মাস আগে ফুসলিয়ে তাকে বিয়ে করেন মাসুম। বিয়ের পরে তিনি জানতে পারেন যে, শিশু বিশেষজ্ঞ তো দূরের কথা মাসুম বিল্লাহ কোনো ডাক্তারই নন। কিছুদিন আগেও বরগুনার একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মো. আলমগীর হোসেনের চেম্বারে ফুট ফরমাসের কাজ করতেন মাসুম বিল্লাহ।
নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কানিজ ফাতিমা সোনিয়া বলেন, এর আগে তিনি বিবাহিতা ছিলেন। তার স্বামী বিদেশে থাকতেন। তার একটি শিশু ছেলে রয়েছে। বছর দেড়েক আগে তার সঙ্গে মাসুম বিল্লাহর পরিচয় হয়। সেই থেকে নিজেকে একজন বড় মাপের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পরিচয় দিয়ে মুঠোফোনে তাকে বিভিন্ন সময়ে প্রেমের প্রস্তাব দিতেন মাসুম।
এক পর্যায়ে ২০১৬ সালের ৫ মার্চ তাকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করেন মাসুম বিল্লাহ। বিয়ের পর থেকেই মাসুম বিল্লাহ তাকে যৌতুকের জন্যে শারীরিকভাবে নিষ্ঠুর নির্যাতন করতে থাকে। এরপর ছ’মাস ১০দিন পরে ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কানিজ ফাতিমা সোনিয়াকে তালাক দেন মাসুম বিল্লাহ।
নির্যাতিত সোনিয়া আরও জানান, তাকে তালাক দেয়ার পরপরই সব কিছু গোপন রেখে মাসুম বিল্লাহ বরগুনার পাতাকাটা এলাকায় তার এক মামাত বোনকে বিয়ে করেন। কিছুদিন পর সেই মামাত বোনকেও তালাক দেন মাসুম বিল্লাহ। এসময় সোনিয়া পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় তার খালু বাড়ি অবস্থান করেন। এরপর পূনরায় সেই খালু বাড়ি গিয়ে খালা খালুর হাতে পায়ে ধরে তাকে (সোনিয়া) বরগুনায় নিয়ে আসেন মাসুম বিল্লাহ।
পরে বাসায় স্থানীয় একজন কাজি ডেকে জোরপূর্বক তার স্বাক্ষর নেন মাসুম। কিন্তু বিয়ের রেজিস্ট্রেশন, কাবিন নামা এমনকি তালাকের কোন কাগজপত্র তাকে কাজি দেয়নি বলে জানান সোনিয়া।
সোনিয়া আরও জানান, বিয়ের পরে এক পর্যায়ে তিনি সন্তান সম্ভবা হলে জোরপূর্বক তাকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে গর্ভপাত করান মাসুম। এ ঘটনার পরে তিনি অনেক দিন অসুস্থ ছিলেন বলে জানান।
বরগুনা শহরের বাজার সড়কে গোলাপ প্লাজার মালিক আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী সামসুন্নাহার (৫০) জানান, গত এক বছর ধরে তাদের ভবনের পাঁচ তলার একটি ফ্ল্যাটে স্ত্রী কানিজ ফাতিমা সোনিয়াকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন মাসুম বিল্লাহ। প্রায় প্রতিদিনই মাসুম বিল্লাহ তার স্ত্রী সোনিয়াকে শারীরিক নির্যাতন করে তালাবদ্ধ করে রেখে যেতেন। প্রথম দিকে বিষয়টি বুঝতে পারেননি তারা। রোববার বিকেলে পূণরায় স্ত্রী সোনিয়াকে নির্মম নির্যাতন শুরু করলে তিনি পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে মাসুম বিল্লাহকে গেফতার করে নিয়ে যায়।
এদিকে গ্রাম ডাক্তার সমিতির সভাপতি গ্রাম ডাক্তার এম এ মোতালেব জানান, মাসুম বিল্লাহ বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের খাকবুনিয়া গ্রামের একিন আলী পহলানের ছেলে। নিজেকে ডিএমএফ এবং ডিএমসিএইচ পাস একজন ডাক্তার বলে পরিচয় দিয়ে বরগুনা শহরে ডাক্তারি করে আসছে সে।
অথচ তারা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, তিনি কোনো বিষয়েই ডাক্তারি পড়াশোনা করেননি। কোনো সার্টিফিকেট যদি মাসুম বিল্লাহ যোগাড় করেও থাকেন তা বানোয়াট ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বরগুনার গ্রাম ডাক্তার সমিতির সাধারণ সম্পাদক গ্রাম ডাক্তার আনোয়ার হোসেন শিমুল জানান, ভুল চিকিৎসায় এক দরিদ্র নারীর মৃত্যুর অভিযোগে মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে বরগুনা থানায় একটি হত্যা মামলা রয়েছে।এর আগে মাসুম বিল্লাহ তার চেম্বারে কর্মরত একজন দরিদ্র নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেন। পরে টাকা পয়সা দিয়ে সে ঘটনাকে ধামাচাপা দেন মাসুম বিল্লাহ।
এ বিষয়ে বরগুনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদুজ্জামান বলেন, নির্যাতনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে নির্যাতিত স্ত্রীকে উদ্ধারের পর অভিযুক্ত মাসুম বিল্লাহকে গ্রেফতার করে বরগুনা থানার পুলিশ। এ বিষয়ে নির্যাতিত গৃহবধূ কানিজ ফাতিমা সোনিয়া বাদী হয়ে রোববার রাতেই বরগুনা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ বিষয়ে পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
সাইফুল ইসলাম মিরাজ/এফএ/জেআইএম