গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার জিনিয়া গ্রামে রাজু মিয়া ও মা সাহিদা বেগমের কোলজুড়ে আসে শিশু তৌফা-তহুরা। পাঁচ বছর বয়সী ছেলে শাহাদাতের পর তাদের জন্ম। তবে কোমড়ে জোড়া লাগানো ‘পাইগোপ্যাগাস’ নামে অভিহিত একটি ত্রুটিতে ওদের জন্ম।
গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর জন্মের পর চারদিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। শিশু দুটিকে দেখতে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। জোড়াশিশু জন্মের পর পেট ফোলা ও বমি হচ্ছিল। এরপর গণমাধ্যমে উঠে আসে তাদের খবর। এ নিয়ে জাগো নিউজেও সংবাদ প্রকাশিত হয়।
এ খবর জানতে পারেন গাইবান্ধা জেলা সিভিল সার্জন ড. নির্মলেন্দু চৌধুরী। তিনি স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহা-পরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে বিষয়টি অবহিত করেন।
তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. মিজানুর রহমানকে জানান। এরপর ঢামেক হাসপাতাল পরিচালকের নির্দেশে শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাহনুর রহমান জোড়াশিশুকে সার্জারি বিভাগের চতুর্থ ইউনিটে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
নবজাতক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মনীষা ব্যানার্জীর অনুমতি সাপেক্ষে স্পেশাল বেবি কেয়ার ইউনিট (এসসিএবিইউ) একটি লোন বেডের ব্যবস্থা করেন।
গত বছরের ৭ অক্টোবর বিশেষ ব্যবস্থাপনায় গাইবান্ধা থেকে জোড়া শিশুকে ঢামেকে স্থানান্তর করা হয়।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুস্তাফিজুর রহমান অ্যাম্বুলেন্সযোগে একজন মেডিকেল অফিসারের তত্ত্বাবধানে তাদেরকে ঢাকায় পাঠান। প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের চিকিৎসকদের মতামত অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে।
ডা. মুস্তাফিজুর রহমান জানান, জোড়া লাগানো দুই শিশুর মা সাহিদা বেগমের গর্ভকালীন সময়ে কোনো প্রকার ডাক্তারি পরীক্ষা বা প্রসূতি পূর্ব পরিদর্শন ছিল না। যদি সেটা থাকত তবে বিষয়টি আগেই হয়তো অনুধাবন করা যেত।
ঢামেকে ভর্তির পর শিশু দুটির অবস্থা খারাপ থাকায় রক্ত পরীক্ষা ও বেবিগ্রাম করা হলেও এমআরআই করা যায়নি।
গত বছরের ১৬ অক্টোবর ১২ বিষেশজ্ঞ চিকিৎসকের মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে সেপ্টিসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে এনে পেটে অস্থায়ী মলদ্বার স্থাপনে অস্ত্রোপচার হয়। কারণ দুজনের পায়খানার রাস্তা ছিল মাত্র একটি। ওই অপারেশনের পর মা সাহিদা দুজনের নাম রাখেন তৌফা-তহুরা।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. সাহনুর ইসলাম বলেন, বিরল জোড়া লাগানো শিশুদের প্রথম অস্ত্রোপচার ছিল চিকিৎসকদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে অবেদনবিদদের(এনেস্থেশিয়া) জন্য। একই সঙ্গে অজ্ঞান করা ও জ্ঞান ফেরানোর কৃতিত্ব সম্পন্ন করেন এনেস্থেশিয়ার সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. এসএম শফিকুল আলম ও বিভাগীয় প্রধান মোজাফফর আহমেদ।
প্রথম অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক ডা. সাহনুর ইসলাম। বিষেশজ্ঞ চিকিৎসকের মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে পুনরায় এমআরআই করার নির্দেশ দেয়া হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গত বছরের ১৬ অক্টোবর জোড়া লাগানো দুই শিশুকে হাসপাতালে দেখতে যান। তখন তিনি ঘোষণা দেন এদের চিকিৎসার সব ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করবে।
এরপর চলতি বছরের ১ আগস্ট সকালে শুরু হয় আলাদা করার অপারেশন। ৯ ঘণ্টাব্যাপী অপারেশন সফলভাবে শেষ হয়। জ্ঞান ফেরে তৌফা-তহুরার। তিনদিন পর স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণও শুরু হয়। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠে তৌফা-তহুরা।
রোববার দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা-মায়ের কোলে শিশু দুটিকে তুলে দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। পাশাপাশি হাসপাতালের ছাড়পত্র তুলে দেন।
জেইউ/জেডএ/এআরএস