দেশজুড়ে

পদ্মা মোর সব লইয়া গেছে

‘মেম্বার-চেয়ারম্যানরা আইজ পজ্জন্ত সাহায্য দেয় নাইকা, বাচ্চা কাচ্চা নিয়া ক্যামনে যে চলি ভাইজান। পদ্মা মোর ঘর-জমিজমা সব লইয়া গেছে। দুইদিন হইল পদ্মার পাড়েই বইয়া থায়ি।’ কথাগুলো বলছিলেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের ওয়াপদা সংলগ্ন সাহেবের চর গ্রামের বিধবা কাকলী বেগম (৩৪)।

মঙ্গলবার রাতে পদ্মার ভাঙনে জমি, বাড়ি-ঘর হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন নড়িয়া বাসতলার একটি বাড়িতে। কাকলী বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মঙ্গলবার রাতে ঘরেই ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঝপ ঝপ শব্দ শুনে জেগে উঠেই দেখতে পান, প্রবল বেগে ভাঙতে শুরু করেছে তার বসত বাড়ি। ঘরের আসবাবপত্র যা ছিল যতটুকু পেরেছেন সরিয়ে নিয়েছেন।

১৪ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পর থেকে এ বাড়িতেই থাকতেন কাকলী বেগম। এই ঘরটিতেই তার বেড়ে ওঠা, সংসার করা। কাকলীর স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন সন্তানকে মানুষ করতে অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। ঘর ছাড়া যতটুকু ফসলি জমি ছিল তা চাষ করতেন।

কাকলী বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, চোখের সামনে পদ্মা নদীর ভাঙনে তার ঘর-বাড়ি, ফসলি জমি তলিয়ে গেছে নদীর গর্ভে। তিনি সব কিছু হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে পথে পথে ঘুরছেন সাহায্যের জন্য।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু কাকলী বেগমই নয় নড়িয়া-জাজিরা উপজেলার এমন হাজার হাজার পরিবারের ঘর-বাড়ি পদ্মার ভাঙনে নদীর গর্ভে তলিয়ে গেছে। ভাঙনে অনেকের প্রাণও গেছে। আবার অনেকে ঘর-বাড়ি ভাঙনের ভয়ে সরিয়ে নিচ্ছে অন্যত্র। তাই এই প্রবল ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে অতিদ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়ের সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলায় পদ্মার ভাঙনে ২০ হাজার ৮৯০ পরিবার গৃহহীন হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৭ সালে গৃহহীন হয়েছে ৩ হাজার ৮৯০ পরিবার। ফসলি জমি বিলীন হয়েছে ৬ হাজার হেক্টর। নদীগর্ভে চলে গেছে ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৬টি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবনসহ সরকারি-বেসরকারি অনেক স্থাপনা।

জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, ভাঙন রোধ করতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে জানানো হচ্ছে। ভাঙনে ঘরবাড়ি ও জমি বিলীন হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে খাদ্য সহায়তা, নগদ অর্থ ও গৃহনির্মাণের সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে। তবে নদী ভাঙনে যারা ভিটেমাটি হারিয়েছে তাদের খাস জমি দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক।

মো. ছগির হোসেন/এফএ/এমএস