পহেলা বৈশাখ উদযাপনে সারাদেশ মেতে উঠলেও বরাবরের মতো কিছুটা ব্যতিক্রম রয়েছে পুরান ঢাকার একটি বিশেষ সম্প্রদায়। তাদের কাছে আজ (১৪ এপ্রিল) চৈত্র সংক্রান্তি। সে হিসেবে আগামীকাল (রোববার) পহেলা বৈশাখ।
আর পহেলা বৈশাখ মানেই হালখাতা। বরাবরের মতো এবারও হালখাতার সব আয়োজন করেছেন পুরান ঢাকার বিশেষ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। রোববার সূর্য উঠার পর পরই শুরু হয়ে যাবে হালখাতা। এই হাল খাতার জন্য ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন তারা।
শনিবার পুরান ঢাকার শাঁখারিবাজার, তাঁতীবাজার ঘুরে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধুয়ে-মুছে পরিচ্ছন্ন করে তুলেছেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে নতুন আলপনা করা হয়েছে। পুরাতনকে বিদায় করে নতুন বছর বরণ করে নিতেই তাদের এ উদ্যোগ। রোববার হালখাতার মাধ্যমে এ ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতায় নতুন হিসাব খুলবেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বী এ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, তারা ‘লোকনাথ পঞ্জিকা’ নামে এক বিশেষ ধরনের পঞ্জিকা অনুসরণ করেন। সেই পঞ্জিকা অনুযায়ী শনিবার চৈত্র সংক্রান্তি।
রাজধানীর শাঁখারিবাজারে বিশেষভাবে পালন করা হয় চৈত্র সংক্রান্তি। শিব-পার্বতি সেজে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একাধিক দল খোল-কর্তাল, মন্দিরার তালে তালে কীর্তন করে ছুটে চলেন এক মহল্লা থেকে আরেক মহল্লায়।
আর উৎসুক মহল্লাবসী ভীড় করে ঘিরে ধরেন তাদের। শিব-পার্বতির কীর্তনের তালেতালে মাগন তুলতে ছুটে চলেন মহল্লার এক দোকান থেকে অন্য দোকানে। হাত পাততেই দোকানিরা সানন্দে অকৃপণভাবে মাধুকরিতে (মাগনের থলে) তুলে দেন মুষ্টিবদ্ধ দান। শনিবারও শাঁখারিবাজারে গিয়ে এ দৃশ্য চোখে পড়েছে।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ী অমলেশ বলেন, ‘এখানে হিন্দু, মুসলিম বলে কিছু নেই। শিব-পার্বতি যার দোকানেই যাক তিনি খুশি মনে মাধুকরিতে মাগন তুলে দেন। এটা আমাদের এখানকার রীতি। আর সব থেকে আকর্ষণীয় উৎসব হয় সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার পরপরই। সাম্প্রদায়িক গণ্ডি অতিক্রম করে এ উৎসবে একাকার হয়ে যান হিন্দু-মুসলিম সবাই’।
হালখাতার বিষয়ে স্বর্ণের কারিগর শংকর বলেন, ‘আমরা বংশ পরম্পরায় এখানে ব্যবসা করছি। রীতি মেনে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে হালখাতা করি। এবারও হালখাতার সব প্রস্তুতি নিয়েছি। তবে আপনাদের হিসাবে আজ পহেলা বৈশাখ হলেও আমাদের হিসাবে পহেলা বৈশাখ আগামীকাল। তাই হালখাতাও হবে আগামীকাল’।
তিনি আরও বলেন, ‘লৌকিক আচার অনুযায়ী আজ আমরা চৈত্র সংক্রান্তি বা বর্ষবিদায় উৎসব পালন করবো। ধুয়ে-মুছে বিদায় করা হবে বিগত বছরের সব জঞ্জাল আর অশূচিতাকে। আর আগামীকাল ( রোববার) খোলা হবে হিসাবের নতুন খাতা (হালখাতা) । এ উপলক্ষ্যে থাকবে ধূপ-ধূনোর সুগন্ধি। দোকানে এসে বিগত বছরের খরিদ্দাররা বকেয়া পরিশোধ করবেন। আমরা তাদের মিষ্টি মুখ করাবো। এছাড়া বিভিন্ন আপ্যায়ন তো থাকবেই। তবে শুধু বকেয়া আদায় নয় এ অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো খরিদ্দারের সঙ্গে টেকসই সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
স্বর্ণের আর এক ব্যবসায়ী সাধন কর্মকার বলেন, বাংলা মাসের শেষ দিনে চমরা স্নান, দান, ব্রত, উপবাসকে পূণ্যের কাজ বলে মনে করি। তাই আজ দিনের বেলা স্নান, দান, ব্রত করে সন্ধ্যায় বিশেষ প্রার্থনা করবো। আর আগামীকাল পুরানো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতে করা হবে হালখাতা। এ দিনটার জন্য আমরা একবছর ধরে অপেক্ষায় থাকি।
এমএএস/এমএমজেড/আরআইপি