মওলবি আশরাফ
পবিত্র কোরআনে সুরা ইউসুফকে আল্লাহ তাআলা ‘আহসানুল কাসাস’ বা সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা বলেছেন। এই সুরায় হযরত ইউসুফের (আ.) জীবন-কাহিনির মধ্য দিয়ে ধৈর্য, আল্লাহর প্রতি আস্থা, সততা ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে গভীর আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি আয়াত দায়িত্বশীল পদে নিয়োগের এমন কিছু নীতি সম্পর্কে ধারণা দেয়, যা সব যুগেই কার্যকর।
প্রেক্ষাপটমিশরের আজিজের স্ত্রী জুলায়খা ব্যাভিচারের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হজরত ইউসুফকে (আ.) জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এরপর অনেক বছর পেরিয়ে যায়। এর মধ্যে মিশরের রাজা এক অদ্ভূত স্বপ্ন দেখেন, কোনো স্বপ্নবিশারদ যার ব্যাখ্যা দিতে পারছিল না। তখন রাজার মদ্যপরিবেশক জানান, অনেক বছর আগে কয়েদখানায় একজনের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল, যিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারেন। রাজা তাকে সেই বন্দির কাছে গিয়ে ব্যাখ্যা শুনে আসতে বলেন।
মদ্যপরিবেশক হযরত ইউসুফের (আ.) কাছে গিয়ে স্বপ্নের কথা বলেন। তিনি এর ব্যাখ্যা করে দিলে তা শুনে রাজা খুবই আশ্চর্য হন। তিনি হজরত ইউসুফকে (আ.) মুক্ত করে রাজদরবারে হাজির করার ফরমান দেন। কিন্তু ইউসুফ (আ.) শর্ত দেন—আগে তার মামলার সত্যতা যাচাই করতে হবে, তবেই তিনি কয়েদখানা থেকে বের হবেন। রাজা সেই মামলার তদন্ত শুরু করেন, অবশেষে জুলায়খা নিজেকে দোষী মেনে স্বীকারোক্তি দিলে ইউসুফকে (আ.) বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। এরপর রাজা তাকে খাদ্যমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। এই সময় রাজা ও ইউসুফের (আ.) মধ্যে যে কথোপকথন হয়, এটি চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রার্থী—উভয়ের জন্য শিক্ষণীয়।
মিশরের রাজা ইউসুফকে (আ.) ‘আপন যোগ্যতায় মর্যাদাশীল ও আস্থাভাজন’ বলে অভিহিত করেন। (সুরা ইউসুফ: ৫৪) এতে স্পষ্ট হয়—যোগ্যতা ও সততা নিয়োগের প্রধান শর্ত। পক্ষপাত বা আত্মীয়তার ভিত্তিতে নিয়োগ করা অন্যায়, বরং প্রমাণিত যোগ্যতাই একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত।
২. মেধা ও নৈতিকতার সম্মিলিত মূল্যায়নরাজা ইউসুফকে (আ.) শুধু দক্ষ নয়, আস্থাভাজনও বলেছেন। (সুরা ইউসুফ: ৫৪) আয়াতটি ইঙ্গিত করে যে দক্ষতা এবং আস্থাভাজন হওয়া—দুটিই নিয়োগে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেবল টেকনিক্যাল জ্ঞান নয়, সাথে বিশ্বস্ততা ও সততাও জরুরি।
৩. সরাসরি যাচাই বা ইন্টারভিউ নেওয়ারাজা ইউসুফের (আ.) সঙ্গে সরাসরি আলাপ করেন। (সুরা ইউসুফ: ৫৪) এ থেকে বোঝা যায় প্রার্থীর দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব যাচাইয়ের জন্য সাক্ষাৎকার অপরিহার্য। কেবল কাগজপত্র বা সিভি নয়, সরাসরি কথোপকথনেই প্রকৃত চরিত্র ফুটে ওঠে।
৪. অতীত নয়, যোগ্যতার গুরুত্ব দেওয়াইউসুফ (আ.) ছিলেন কারাগারের সাবেক কয়েদি। তবুও রাজা তাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব দেন। শিক্ষা হলো—অতীতের দুর্ভাগ্য বা সামাজিক অবস্থান কাউকে কর্মজীবনে অযোগ্য প্রমাণ করতে পারে না, যদি তার প্রকৃত যোগ্যতা স্পষ্ট হয়।
ইউসুফকে (আ.) খাদ্যমন্ত্রণালোয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়, কারণ এ কাজে তিনি সবচেয়ে উপযুক্ত ছিলেন। শিক্ষা হলো—দক্ষতা-ভিত্তিক পদায়ন (merit-based placement) নিশ্চিত করা। দায়িত্ব বণ্টনে অদক্ষ বা অযোগ্য ব্যক্তিকে বসানো সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
৬. সুযোগ দিয়ে মর্যাদা বৃদ্ধি করারাজা ইউসুফকে (আ.) শুধু মুক্ত করেননি, বরং সম্মানজনক পদ দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়—প্রকৃত যোগ্য কর্মীকে সম্মান ও মর্যাদা দিলে তার কর্মোদ্যম বাড়ে, এবং প্রতিষ্ঠানও লাভবান হয়।
চাকরিপ্রার্থীর জন্য শিক্ষা ১. নিজের সততার প্রমাণ দেওয়াইউসুফ (আ.) নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করেন। তিনি রাজার ফরমান উপেক্ষা করে সবার আগে তার মামলা যাচাই করতে বলেন। (সুরা ইউসুফ: ৫০ - ৫২) এর মানে—কোনো চাকরিতে প্রবেশের আগে সততার দিকটি নিয়োগদাতাকে বোঝাতে হবে। শুধু ডিগ্রি নয়, নৈতিক গুণাগুণ হলো প্রথম যোগ্যতা।
২. নিজের দক্ষতা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করাইউসুফ (আ.) সাহসের সঙ্গে নিজের যোগ্যতা প্রকাশ করেন, তিনি বলেন—আমাকে কোষাগারের দায়িত্ব দিন। (সুরা ইউসুফ: ৫৫) এর মানে—প্রার্থীকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে তিনি কী কী করতে পারেন এবং কোন দায়িত্ব নিতে চান। একই সাথে তার কথায় যেন এমন যোগ্যতা প্রকাশ না পায়—যার ওপর তার নিজেরই আত্মবিশ্বাস নেই।
এ ছাড়াও এখানে ইউসুফ (আ.) নিজেই দায়িত্ব চান। এর মানে—যদি প্রার্থী সত্যিই যোগ্য হয়, তবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নিজেকে প্রস্তাব করা যেতে পারে।
৩. সততা ও পেশাগত জ্ঞান অপরিহার্যইউসুফ (আ.) নিজের সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘আমি হেফাজতকারী ও জ্ঞানসম্পন্ন।’ (সুরা ইউসুফ: ৫৫) চাকরির ভিত্তি হলো সততা। চরিত্রহীন প্রার্থী যতই দক্ষ হোক, দীর্ঘমেয়াদে তিনি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন। অন্যদিকে কেবল ভালো মানুষ হওয়াও যোগ্যতা নয়, বরং পেশাগত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সমস্যা সমাধানে (problem-solving) দক্ষতা থাকা আবশ্যক।
ওএফএফ