ঢাকায় নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত পার্ক ইয়ং-সিক বলেছেন, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে ‘কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট বা ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা)’ আলোচনায় রয়েছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে দুই দেশের বিদ্যমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
রোববার (১৯ অক্টোবর) ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত ‘কোরিয়ান বিনিয়োগকারীদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ একসাথে’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশ কীভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারিত করতে পারে সে বিষয়ে উভয়পক্ষ কাজ করছে।
পার্ক ইয়ং-সিক বলেন, কোরিয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতার বাইরে কোনো কৌশলগত স্বার্থ অনুসরণ করে না। কোরিয়া ও বাংলাদেশ উভয়ই বিগত ৫০ বছরের অর্জনের ওপর ভিত্তি করে আরও উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, কৌশলগত অবস্থান এবং প্রচুর শ্রমশক্তির কারণে বাংলাদেশ এখনো দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।
রাষ্ট্রদূত বলেন, বিনিয়োগের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যেমন: সময়মতো ভিসা ইস্যু ও নবায়ন, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সহজ করা, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক হ্রাস, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ডলার পেমেন্টে বিলম্ব সমাধান করা এবং বিদেশি কোম্পানিকে লাভ ফেরত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।
পার্ক ইয়ং-সিক বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি কোরিয়ার বাজারে প্রতি বছরই বাড়ছে, তবে রপ্তানি পণ্যের পরিসর সীমিত হওয়ায় পরিমাণ এখনো সন্তোষজনক নয়। জুতা, আইসিটি পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, হালকা শিল্পপণ্য এবং ওষুধ কোরিয়ার বাজারে আরও রপ্তানি করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সিইপিএ চুক্তি হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যের জন্য কোরিয়ার বাজারে প্রবেশাধিকারে নতুন গতি আসবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, টেকসই ও স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়তে বাংলাদেশকে অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। কোরিয়া বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে চায়, যেমনটি আমরা তৈরি পোশাক খাতে ছিলাম।
আরও পড়ুনবাংলাদেশ-কুয়েত শ্রম সহযোগিতাসহ বিভিন্ন খাতে শিগগির নতুন চুক্তিফ্রি ভিসা-রেমিট্যান্স জটিলতা নিরসনে মালদ্বীপ হাইকমিশনের আশ্বাস
কোরিয়ান কোম্পানিগুলো মানসম্মত কাজের জন্য পরিচিত এবং তারা বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অব্যাহতভাবে অবদান রাখতে আগ্রহী বলে রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন। তবে সরকারকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেন বিদেশি কোম্পানিগুলো অবকাঠামো প্রকল্পে অংশ নিতে পারে বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, উন্নয়ন সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) প্রাপকের তৃতীয় দেশ।
তিনি বলেন, কোইকা টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ট্রেনিং খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষক সংকট, প্রযুক্তিগত ঘাটতি ও পুরোনো সরঞ্জাম হালনাগাদে সহায়তা দিচ্ছে, যেন বাংলাদেশের শ্রমশক্তি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুত থাকে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, কোরিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ, যা একসময় ওডিএ গ্রহণকারী ছিল, আর এখন দাতা দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আমরা নিজেদের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে ভাগ করতে আগ্রহী।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭৩ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও কোরিয়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও জনগণের মধ্যে বিনিময়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত ৫০ বছরে তৈরি পোশাক খাতে সহযোগিতাই আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রধান চালিকাশক্তি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সূচনালগ্নে কোরিয়ান কোম্পানি ডেশ গার্মেন্টস ও দাইউ করপোরেশনের ১৯৭৯ সালের সহযোগিতা ছিল ঐতিহাসিক। এরপর থেকে অনেক কোরিয়ান কোম্পানি বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের দ্রুত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
পার্ক ইয়ং-সিক বলেন, চট্টগ্রামের ‘কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড)’ বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি, দেশভিত্তিক ইপিজেড, যা বর্তমানে প্রায় ১.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি এবং ৭০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
রাষ্ট্রদূত বরেন, ইয়ংওন করপোরেশন বাংলাদেশের টেকসই ব্যবসা ও পরিবেশবান্ধব শিল্প উন্নয়নের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তিনি বলেন, ইয়ংওনের ব্লু অ্যান্ড গ্রিন ইনিশিয়েটিভ পরিত্যক্ত জমিকে একটি সবুজ ইকোসিস্টেমে রূপান্তর করেছে, যেখানে তিন মিলিয়নের বেশি গাছ লাগানো হয়েছে এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রুফটপ সোলার প্রকল্পে ৩৭ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে।
এছাড়া কোম্পানিটি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নারীর ক্ষমতায়নে নানা সিএসআর কার্যক্রম চালাচ্ছে, যেমন ১০০ শয্যার হাসপাতাল, ফ্যাশন ও টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট এবং স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি কর্মসূচি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ইয়ংওনের পরিবেশ সংরক্ষণ ও সম্প্রদায় উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির চেতনার প্রতিফলন।
কোরিয়ান দূতাবাস, দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (কোইকা) এবং কোরিয়া ট্রেড-ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি (কোটরা) আয়োজিত সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন কোরিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (কেবিসিসি) সভাপতি শাহাব উদ্দিন খান এবং কোইকা বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর জি হুন কিমসহ ইয়ংওন, দোহওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং, এলজি, উরি ব্যাংক ও স্যামসাং (ইলেকট্রনিকস ও গবেষণা বিভাগ) প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
জেপিআই/ইএ/জিকেএস