প্রবাস

মালয়েশিয়ায় রাতভর আতঙ্ক, ভোরে অভিযান

মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের জীবনে আতঙ্ক যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। রাত নামলেই উৎকণ্ঠা, ভোর হলেই অভিযানের আশঙ্কা। দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগের ধারাবাহিক ঝটিকা অভিযানে প্রতিদিনই ধরা পড়ছেন শত শত প্রবাসী।

সেলাঙ্গর রাজ্যের গোম্বাক এলাকায় চালানো প্রথম সমন্বিত অভিযানে বাংলাদেশিসহ ৯ দেশের মোট ১৪৭ জন প্রবাসীকে আটক করেছে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ (জিম)।

ইমিগ্রেশন আইন ১৯৫৯/৬৩ লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক হওয়া এসব প্রবাসীর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, থাইল্যান্ড, নাইজেরিয়া ও চীনের নাগরিক।

অভিযানে ইমিগ্রেশন বিভাগ ছাড়াও পুলিশ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সংস্থার মোট ১৭৭ জন কর্মকর্তা অংশ নেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই আবাসিক এলাকা, নির্মাণ সাইট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘিরে ফেলে শুরু হয় সাঁড়াশি অভিযান।

সেলাঙ্গর রাজ্যের ইমিগ্রেশন পরিচালক তুয়ান খাইররুল আমিনুস বিন কামারুদ্দিন বলেন, অবৈধ প্রবাসী ও নথিবিহীন শ্রমিক নিয়োগের বিরুদ্ধে সরকার আপসহীন। এ ধরনের অভিযান নিয়মিত, ধারাবাহিক এবং আরও বড় পরিসরে চালানো হবে।

আটক সবাইকে প্রাথমিক যাচাই ও তদন্তের জন্য সেমেন্যিহ ইমিগ্রেশন ডিপোতে পাঠানো হয়েছে। কাগজপত্রে অনিয়ম প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও বহিষ্কার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছে ইমিগ্রেশন বিভাগ।

এই অভিযানের পর থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। অনেকেই কাজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, কেউ আবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছাড়ছেন।

গোম্বাকের এক বাংলাদেশি শ্রমিক বলেন, ভিসা নবায়নের আবেদন দেওয়া আছে, কিন্তু এখনও অনুমোদন আসেনি। তবুও ধরা পড়লে ডিটেনশন এটাই সবচেয়ে বড় ভয়।

প্রবাসীদের অভিযোগ, দালালচক্র ও কিছু নিয়োগকর্তার গাফিলতির দায় শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদেরই বইতে হচ্ছে। বৈধভাবে কাজ করতে চাইলেও জটিল প্রক্রিয়া ও বিলম্ব তাদের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শ্রমবাজার গবেষক ড. নুর ফারহানা আজমি বলেন, আইন প্রয়োগ জরুরি, তবে কেবল ধরপাকড় দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বিদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও দালালচক্র ভাঙতে না পারলে শ্রমিকরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তার মতে, আকস্মিক অভিযান নির্মাণ, পরিষেবা ও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, আটক বাংলাদেশিদের তালিকা সংগ্রহ ও কনস্যুলার সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আটক নাগরিকদের অধিকার রক্ষা ও ন্যায্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে আমরা মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।

একই সঙ্গে প্রবাসীদের বৈধ কাগজপত্র হালনাগাদ রাখা ও আইন মেনে চলার আহ্বানও জানিয়েছে হাইকমিশন।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আগামী দিনগুলোতে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে ইমিগ্রেশন অভিযান আরও জোরদার হতে পারে। এতে আতঙ্ক বাড়লেও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট-আইনের ব্যত্যয় হলে ছাড় নেই।

প্রবাসীদের প্রশ্ন একটাই, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক সমাধান কি আদৌ আসবে? নাকি আতঙ্কের এই চক্র আরও দীর্ঘ হবে?

এমআরএম