গত ৭ জানুয়ারি রাতের ঘটনা। বাস চালক মুরাদ। সারাদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যশোর শহরে বাসের ভিতরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু কে জানতো এই ঘুমই কাল হবে তার। দুর্বৃত্তরা বাসে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলে পুড়ে যান ঘুমন্ত মুরাদ।গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। গত রোববার সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিরনিদ্রায় ঢলে পড়েন বাস চালকের এই সহকারী। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মুরাদের শরীরের ৩৭ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে কণ্ঠনালী পুড়ে যাওয়ায় আশঙ্কায় ছিলেন বার্ন ইউনিটের চিকিৎকরাও। শেষ অবধি টিকতে পারেননি তিনি।অপরদিকে পাঁচ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অমূল্য চন্দ্র বর্মণ। রিকশা চালিয়ে পরিবার চালান। মাসখানেক ধরে নারায়ণগঞ্জ শহরে রিক্সা চালিয়ে টাকা জমিয়েছেন। গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে যাবার জন্য গত শনিবার সকালে বের হন। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে পৌঁছালে ওই বাসটিই দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে। দুর্বৃত্তদের দেয়া পেট্রোল বোমায় সারা শরীর পুড়ে যায় তার।পরে স্থানীয়দেররা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করান। সোমবার রাতে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, অমূল্য বিছানায় কাতরাচ্ছেন। তিনি জাগোনিউজকে জানান, অনেক কষ্টে টাকা রোজগার করেছি। ইচ্ছে ছিল বাসায় যাবো। কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না। আমার স্থান এখন মেডিকেলের বার্ন ইউনিট।অমূল্য চন্দ্র শুধু নন, চলমান এই অবরোধে অনেক বাসচালক, হেলপারদের মতো নিরীহ মানুষেরা পিকেটারদের ইটপাটকেল, পেট্রোলবোমা ও ককটেলের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছেন।শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যে মারা গেছেন আরো কয়েকজন। কলুষিত রাজনীতির নির্মমতার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অমূল্য চন্দ্র জানান, স্ত্রীকে নিয়ে তিন সন্তানের সংসার তার। বড় ছেলে নিতাই চন্দ্র বর্মণ এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট দুই ছেলের মধ্যে রতন চন্দ্র বর্মণ ৫ম শ্রেণীর ছাত্র এবং জয় চন্দ্র বর্মণের বয়স তিন বছর।তিনি বলেন, আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত নই। তবুও আমি কেন জ্বলবো, পুড়বো? আমি রাজনীতি বুঝি না। দিন আনি দিন খাই। রিকশা চালানোর টাকা দিয়ে সংসার চলে। কাজ না করলে পরিবারকে অনাহারে থাকতে হয়। জানি না এখন পরিবারের কী হবে?ঢামেক বার্ন ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রোলবোমা ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে সোমবারেই ১৩ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪ জন চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেলেও ৮ জন এখনো ভর্তি রয়েছেন।বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ সঙ্কর পাল জাগোনিউজকে বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহতদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পোড়া রোগীদের অধিকাংশেরই শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি।বার্ন ইউনিটের ডাক্তার সামন্ত লাল সেন বলেন, দলীয় রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার বিষয়ে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।ঢামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারির পর রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে রাজধানীর অন্তত ৫০ ব্যক্তি এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পিকেটারদের আঘাতে আহত হয়ে ভর্তি হয়েছেন আরও ৫ জন। এরমধ্যে আতিকুর রহমান নামে এক ট্রাকচালক সোমবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা জান বলেও জানান তিনি।রাজনৈতিক জিঘাংসার শিকার আহত ব্যক্তিদের দেখতে এসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, অবরোধে নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে বিএনপির এমন রাজনৈতিক কর্মসূচি মেনে নেয়নি জনগণ। সে কারণে বিএনপি’র সঙ্গে আলোচনাও নয় বলে জানান তিনি।তিনি বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে সরকার। নিহতদের পরিবারকেও সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।-জেইউ/বিএ/এআরএস