দেশজুড়ে

সাহায্য নিয়্যা কেউ আসে নাই ভাইজান

গাইবান্ধা সদর উপজেলার খামার বোয়ালী এলাকার চা দোকানি রেজাউল করিম মুন্সি (৪০) আর স্ত্রী পারভীন বেগম (২৫) থকথকে পচা কাঁদা আর গোড়ালিডোবা পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে বিধ্বস্ত ঘর ঠিক করছিলেন। জিজ্ঞেস করতেই মনে হলো তারা নিজেদের ওপরই মহা বিরক্ত। বললেন, ফুলছড়ির সিংড়িয়্যা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে ১১ দিন আগে ঘরবাড়িতে বুক সমান পানি ঢোকে। পাশের খেয়াঘাট-কালিরবাজার সড়কও ডুবে যায়। সেই সড়কের পাশেই উঁচু জায়গায় চৌকি পেতে ছয় ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কোনোমতো রাত পার করেছেন। শুক্রবার রাতে ঘর থেকে পানি নামার পর শনিবার দুপুরে বাড়িতে ঢুকে সবকিছু ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এ এক কঠিন কাজ। টিন ভেসে গেছে, খুঁটি দু’টুকরো। হাতে টাকাও নেই। কিভাবে কাজ  করবেন। পারভিন বেগম বললেন, বন্যাত ভাসি গেলাম। সাহায্য নিয়্যা কেউ আসে নাই ভাইজান। সরকার সাহায্য না করলে এতগুল্যা মানুষ কি খাবে, কোটে থাকপ্যে, অল্লা মালুম। আর একটু এগিয়ে ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালি ইউনিয়নের বুড়াইল গ্রামে গিয়ে দেখা গেল একই চিত্র। বুড়াইল-ফুলছড়ি সড়কের পাশের কিছু কিছু ঘর থেকে পানি নামলেও আঙিনায় জলাবদ্ধতা কাটেনি। প্রথম দু’তিনদিন সড়কে রাত কাটালেও পরে অন্যের বাড়িতে উঠেন অসুস্থ স্বামী সবেদ আলীকে নিয়ে বৃদ্ধা হামিদা বেগম (৬৫)। তিনি বলেন, ওমারতো তাও বাড়ি ভাসছে। হামার কোনা দেখেন, খালি টিনের চালা দেখা যায়। কার্তিক মাসের আগে ওই বাড়িত ওঠা যাব্যা নয়। মানস্যের কাছে হাত পাইত্যা চলা নাগব্যে। একইভাবে অন্যের বাড়িতে আছেন ইন্দুবালা (৬০), ফুলমতি বেগম (৫৫), আব্দুল ওয়াহেদ। বিপাকে আছেন অবস্থাপন্ন জসিজল হকও (৫৫)। তার মুরগির খামার গেছে, বাড়ির বেহাল দশা। বৃহস্পতিবার বেয়াই বাড়ি থেকে পরিবারের ১১ সদস্যকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। জিনিসপত্র টানতে গিয়ে ক্লান্ত মানুষটি বললেন, সাহায্য চাই না। সরকার বাঁধ ঠিক করে দেক। না করলে এখানে আর থাকা সম্ভব নয়। এলাকার সমাজসেবী শামসুজ্জোহা বাবলু জানান, ধনী গরীব ব্যাপার না। বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি, ঘরবাড়ি মেরামতসহ সবক্ষেত্রে সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচি অবিলম্বে শুরু করা না গেলে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যাবে না।     শনিবার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কিছু কিছু এলাকা বাদে প্রায় সব জায়গাতেই ঘরবাড়ি জেগে উঠছে। তবে কাঁদা পানিতে একাকার। বাঁধ, সড়কের উঁচু অংশ, অন্যের বাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে ফিরছেন মানুষ। ফুলছড়ির উদাখালীর তাহমিনা বেগম জানান, এতোদিন নলকূপগুলো পানিতে ডুবে ছিল। এখন সেগুলো সংস্কার করা দরকার। তানা হলে অসুখ-বিসুখ ছড়িয়ে পড়বে। এলাকার লোকজন অনেক দূর থেকে পানি এনে খাচ্ছেন। পাশাপাশি কাঁদা পানিতে পা রেখে চলাচল করায় নানা ধরনের চর্ম রোগে ভুগছেন বন্যার্তরা। কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, রোপা আমনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। বিধ্বস্ত বাড়িঘর মেরামতেও সাহায্য প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা. নির্মলেন্দু চৌধুরী বলেন, মানুষকে সচেতন থাকতে বলা হচ্ছে। মেডিকেল টিমগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সামাদ বলেন, বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার জন্য সব বিভাগ ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ ও পুনর্বাসন প্রস্তাবনা তৈরি করছে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরিভাবে ৫ হাজার বান্ডিল ঢেউটিন ও ৫০০ তাবু চাওয়া হয়েছে। অমিত দাশ/এসএস/আরআইপি