দেশজুড়ে

ঘুষ না দিলেই ‘ভুল’!

বেলা সাড়ে ১১টা। ছোট ছোট লাইন। অফিসের মধ্যে পাসপোর্টের আবেদন জমা নেওয়ার কাউন্টারের চিত্র এটি। বাইরে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়। ভেতরের চেয়ারে বসে আছেন কাউন্টারম্যান সাজেনুর। কিন্তু তার কাজ এগুচ্ছে না। আবেদনপত্র জমা নিচ্ছেন। একটু সময় এ পাতা সে পাতা উল্টে ভুল আছে উল্লেখ করে সেই আবেদনপত্র আবার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কী ভুল, কিংবা কী সংশোধন করতে হবে তা বলা হচ্ছে না।বগুড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে এতটাই অনিয়ম এবং দালালদের দৌরাত্ব বেড়েছে যে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের পাসপোর্ট করতে এসেও নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। এ কারণে বাধ্য হয়েই তারা দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ছেন। দেখা গেলো অন্য কাউন্টারে ডেলিভারি ম্যানের চেয়ার ফাঁকা থাকায় সেখানে কাজ করছেন নৈশ প্রহরী লিংকন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তা আলমগীর হোসেন (এমএলএসএস) না থাকায় লিংকনের এই চেয়ারে বসে কাজ করছেন তিনি। কাজ বলতে দু’একজনের কাছ থেকে ডেলিভারি স্লিপ নিয়ে পাসপোর্ট খোঁজাখুঁজি করছেন। কিন্তু একটু পর পাসপোর্ট আসেনি বলে স্লিপ ফিরিয়ে দেন কাউন্টারের ওপারে অপেক্ষায় থাকা মানুষদের। তবে দুই কাউন্টারেই একটি কাজের ক্ষেত্রে চরম মিল দেখা গেলো। পরিচিত মুখের মানুষের হাত থেকে স্লিপ এলেই পাসপোর্ট খুঁজে পাচ্ছেন তারা। কাউন্টারের বাইরে থাকা সেই মানুষের হাতে বিদ্যুৎ গতিতে পৌঁছে যাচ্ছে পাসপোর্ট। আবেদনপত্র জমা নেওয়ার বেলায় একই দৃশ্য চোখে পড়লো।লাইনে দাঁড়ানো অপেক্ষমানদের একজন আব্দুল হামিদ জানালেন, দালাল ধরলে কোনো কাজেই সমস্য হয় না। ঘুষ দিলে অল্প সময়েই হাতে এসে পৌঁছায় কাঙ্খিত পাসপোর্ট। আর জমা হয়ে যায় পাসপোর্টের আবেদনপত্রগুলোও। তখন কারও চোখে আবেদনপত্রে কোনো ভুল ধরা পড়ে না। পাসপোর্টও খুব তাড়াতাড়ি খুঁজে পাওয়া যায়। এজন্য অবশ্য পাসপোর্ট প্রতি ৫০০-৭০০ এবং প্রত্যেক আবেদনপত্রের জন্য ৯০০-১০০০ টাকা বেশি দিতে হয়। সরেজমিনে দেখা গেলো,  ভবনের প্রধান ফটকের বাইরে দাঁড়ানো একজন দালালের কাছ থেকে একটি আবেদনপত্র নিয়ে দ্রুত কক্ষে চলে এলেন আনসার সদস্য সাদেকুল। গেটে তখন ছিলেন পোশাক পরিহিত অবস্থায় মহেন্দ্র। আর অফিসের ভেতরে ফাইল নিয়ে ছুটোছুটি করছিলেন রানু নামের আরো একজন আনসার সদস্য। দালালদের দেয়া ফাইলগুলো এরা নিয়ে যাচ্ছেন কাউন্টারম্যান সাজেনুরের কাছে। তিনি ফাইলে বিশেষ একটি সাঙ্কেতিক চিহ্ন এঁকে সেটি জমা রাখছেন।আমিনুল, হবিবর, সাইফুল ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে জানান, সকাল ১০টা থেকে তারা পাসপোর্ট পেতে নির্ধারিত স্লিপ হাতে এই কাউন্টারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দেড় ঘণ্টা পরও বেলা সাড়ে ১১টায় নির্ধারিত চেয়ারে কোনো লোকের দেখা মেলেনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী সহকারী পরিচালকের পদমর্যাদার পাসপোর্ট অফিসার পাসপোর্ট অফিসের মূল দায়িত্বে থাকেন। তার অধীনে উচ্চমান সহকারী, হিসাব রক্ষণ সহকারী, ডাটা এন্ট্রি সহকারী, অফিস সহকারী, গার্ড ও এমএলএসএস নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন। পাসপোর্টের আবেদন ঠিক আছে কি না তা দেখে জমা নেয়ার দায়িত্ব পাসপোর্ট অফিসারের। কিন্তুু বগুড়া পাসপোর্ট অফিসে বেশিরভাগ সময়ই তা জমা নেন গার্ড ও আনছার সদস্যরা। সাধারণত সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত পাসপোর্টের আবেদন জমা নেয়ার নিয়ম। কিন্তু কাউন্টারে নিয়মমতো ১ ঘণ্টাও থাকেন না দায়িত্বপ্রাপ্তরা। যার কারণে লাইনে দাঁড়ানো আবেদনকারীরা ভোগান্তির মধ্যে পড়েন। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, দালাল চক্রের নিয়ন্ত্রণে আবেদন জমা নেয়া শুরু হয় পেছনের দরজা দিয়ে। কখনও অফিস সময়ের পরও চিহ্নিত দালালদের আবেদনপত্র নির্দিষ্ট স্থানে জমা করতে দেখা যায়। লাইনে দাঁড়ানো আবেদনকারীদের নানাভাবে জানানো হয় এভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট মিলবে না। তারা বাধ্য হয় দালালচক্রের র্যাকেটে পড়তে। আবেদন জমা দেয়ার পর ছবি তোলার দিনক্ষণও ঠিক করে দেয় দালালরা। সেখানেও চরম অনিয়ম। দালাল ও উচ্চমান সহকারী যা বলে সেভাবেই কাজ হয়।সরকারি কলেজের একজন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক নো অবজেকশন সার্টিফিকেটসহ (এনওসি) আবেদন জমা দেয়ার পরও পাসপোর্ট অফিসের একজন উচ্চমান সহকারীর কাছে দুই দফায় হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। পরে দালাল ধরে ১২শ টাকা ঘুষ দিয়ে তিনি আবেদনপত্র জমা দেন।অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, অফিস প্রধানসহ অপর দুইজন ছাড়া অবশিষ্ট স্টাফরা দালালদের সঙ্গে এই ঘুষের টাকা লেনদেন করেন। আর দিন শেষে তা পদ অনুযায়ী সবার মধ্যে বণ্টন হয়। বগুড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের একজন কর্মকর্তা বললেন, স্বাভাবিক নিয়মে একটি পাসপোর্ট পেতে ২১ কর্মদিবস লাগে। এ জন্য ব্যাংকে ৩ হাজার ৪৫০ টাকা জমা দিতে হয়। আর জরুরি পাসপোর্ট পেতে চাইলে জমা দিতে হয় ৬ হাজার ৯০০ টাকা। এ জন্য সময় লাগে ৮ কর্মদিবস। এসব টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জমা দিয়ে সেই জমা রশিদসহ আবেদন করতে হয়। তিনি বলেন, এই অফিসে পাসপোর্টের জন্য গড়ে প্রতিদিন ১২০-১২৫টি আবেদনপত্র জমা পড়ে। একই ভাবে প্রতিদিন গড়ে ৮০-৯০টির মত পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়া হয়। জানা গেছে, দালালরা টাকা নিয়ে যে শুধু নির্বিঘ্নে পাসপোর্ট আদান প্রদান করছেন তা নয়, তারা চুক্তিতে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটও করে দিচ্ছেন। এজন্য পাসপোর্ট প্রতি অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে ১ হাজার টাকা। উল্লেখযোগ্য এসব দালালদের মধ্যে রয়েছেন আশরাফ, কবির, রতন দেবনাথ, ফিরোজ মজিদ, জাহিদ, হেলাল, মিথুন, খালেক ও আমিনুর ও কাজলী। অফিসের কাউন্টারম্যান সাজেনুর এদের নিয়ন্ত্রণ করেন। একইসঙ্গে প্রতিদিন কালেকশনের টাকা সকলের মাঝে ভাগবাটোয়ারা করার দায়িত্বও তারই।তবে এসব অনিয়ম ও অর্থ আদায় প্রসঙ্গে বগুড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক সালাউদ্দিন বলেন, এই অফিসের ভেতরে কোনো দালাল নেই। অতিরিক্ত অর্থও নেয়া হয়না। বাইরে দালাল থাকলে আমার কিছুই করার নেই। আমি চেষ্টা করি সকলকে দ্রুত সহযোগিতা করার।লিমন বাসার/এফএ/এমএস