দেশজুড়ে

অঙ্কুরেই বিনষ্ট বরগুনাবাসীর স্বপ্ন

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের উপকূলীয় জেলা বরগুনা। নানামুখী সম্ভাবনা বার বার হাতছানি দিলেও রহস্যময় কারণে শেষ পর্যন্ত হতাশা নিয়েই নিশ্চুপ থাকতে হচ্ছে এ জেলার প্রায় পনের লাখ বাসিন্দাকে। এ জেলায় সম্প্রতি সরকারের বেশ কয়েকটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা আর আলোর মুখ দেখেনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের সেইসব বিশেষ প্রকল্পগুলো এখন বাস্তবায়ন হচ্ছে আশপাশের জেলাগুলোতে। আর এসব না পাওয়া নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। বরগুনার স্থানীয় একটি উন্নয়ন সংগঠনের প্রধান নির্বাহী হোসনে আরা হাসি বলেন, ‘যোগাযোগ সুবিধাবঞ্চিত বরগুনা ও এর আশপাশের জেলা ও উপজেলাগুলোর জন্য বরগুনায় একটি মেডিকেল কলেজের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। অথচ সেই মেডিকেল কলেজ হলো বরিশাল মেডিকেল কলেজ থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে পটুয়াখালী জেলায়।’তিনি আরো বলেন,  বরগুনার পায়রা নদীর শেষ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর হিসেবে পায়রা সমুদ্র বন্দর নামে যে বন্দর স্থাপনের কথা ছিল তাও চলে গেল পটুয়াখালীর কলাপাড়ায়।বরগুনার সর্বজন পরিচিত সাংস্কৃতিক সংগঠক প্রবীণ সাংবাদিক চিত্তরঞ্জন শীল বলেন, ‘ক’দিন আগে শুনলাম বরগুনায় ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন করা হবে। এখন শুনছি তাও নাকি বরিশাল জেলার কোথাও হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘যতদূর শুনেছি, ক্যান্টনমেন্ট স্থাপনের জন্যে বরগুনার ফুলঝুড়ি ইউনিয়নের একটি গ্রামে পর্যাপ্ত সরকারি খাস জমিও ছিল এবং প্রাথমিকভাবে তা নির্ধারিতও হয়েছিল। কিন্তু কী কারণে শেষ পর্যন্ত তা আর হলো না সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানতে পারিনি।’খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৬-এর নির্বাচনে বরগুনার আমতলী-তালতলী থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর প্রতিদানে পশ্চাৎপদ বরগুনা জেলার ভাগ্যোন্নয়নে জেলার পায়রা নদীতে বাংলাদেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর `পায়রা বন্দর’নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।এরপর ২০১৩ সালে পায়রা বন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু পায়রা নদীর নামে পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণের কথা থাকলেও পায়রা নদী থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে পটুয়াখালী জেলার আন্দারমানিক নদীতে পায়রা সমুদ্র বন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।  এছাড়া ২০১২ সালের প্রথম দিকে দেশে একটি পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙা শিল্প স্থাপনের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে শিল্প মন্ত্রণালয়। উপকূলীয় এই জেলার পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পের স্থান নির্ধারণ করা হয় বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার বলেশ্বর নদীর তীরের গাববাড়িয়ায়।উন্নয়নবঞ্চিত দক্ষিণাঞ্চলের প্রত্যন্ত জনপদ পাথরঘাটায় জাহাজ ভাঙা শিল্প স্থাপন করার পরিকল্পনায় আশার সঞ্চার হয় গোটা উপকূলীয় জনপদে। দেশে প্রথমবারের মতো `পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙা শিল্প` স্থাপনের জন্য এর সমীক্ষার কাজ শেষও করেছিল শিল্প মন্ত্রণালয়। ২০১১ সালে স্থান পরিদর্শন করে  `পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙা শিল্প` স্থাপনের ঘোষণা দেন তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী দীলিপ বড়ুয়া। পাথরঘাটা উপজেলা থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে সদর ইউনিয়নের গাববাড়িয়ায় প্রকল্পটি স্থাপনের জন্য ৫২ একর জমিও অধিগ্রহণ করা হয়। এরপর দীর্ঘ পাঁচটি বছর পার হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। বরগুনার জেলা তথ্য বাতায়ন সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা জেলার শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের প্রধান পেশা মৎস্য শিকার এবং কৃষি কাজ। কৃষি এবং মৎস্য আহরণ ছাড়া জেলায় বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় এখানকার বাসিন্দারা বংশ পরম্পরায় জড়িত এ কাজে। এছাড়াও চিকিৎসা ও শিক্ষা থেকেও পিছিয়ে এ জেলার মানুষ। বৈশ্বিক উত্তাপ বেড়েছে। তাই বাড়ছে পানির উচ্চতাও। বাড়ছে নদী ভাঙন। লবণাক্ততায় নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। এছাড়াও প্রতি বছরই হানা দিচ্ছে কোনো না কোনো দুর্যোগ। এতো কিছুর পরও শুধু বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় বাধ্য হয়েইে কৃষিতেই মনোনিবেশ করতে হচ্ছে জেলার কৃষকদের।আর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে মৎস্য শিকার করে সরকারকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দেয়ার পরও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত জেলেরা। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রাণহানি তো আছেই ! সেই সঙ্গে জলদস্যুরাও কেড়ে নিচ্ছে তাদের প্রাণ।খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, বরগুনার পায়রা নদীতে সেতু নির্মাণের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে চীন সরকার। গত বছরের ২৬ আগস্ট সকালে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সপ্তম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর দায়িত্ব চীনের কাছে হস্তান্তরের পর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছিলেন।সেতুমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে আরো নতুন দুটি সেতু (নবম ও দশম মৈত্রী সেতু) নির্মাণে চীন সরকার সহায়তা করবে। সম্ভাব্য ওই সেতু দুটিই নির্মিত হবে বরগুনার আমতলী এবং পটুয়াখালীর গলাচিপায়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর দেয়া তথ্যের পর থেকে ব্যাপক আশার সঞ্চার করে বরগুনার সচেতন মহলের মাঝে। কিন্তু সেই সেতুও আর নির্মাণ হচ্ছে না।বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সোহেল হাফিজ বলেন, ১৯৯৬-এর নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বরগুনা এসেছিলেন তখন তার কাছে বরগুনা ও বরগুনাবাসীর উন্নয়নে ৪২ দফা দাবি পেশ করা হয়েছিল। ওই ৪২ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম দাবি ছিল বঙ্গোপসাগর বিধৌত বরগুনাকে পর্যটন জোন হিসেবে ঘোষণা করে নানামুখী প্রকল্প গড়ে তোলা। বরগুনার উন্নয়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছেন জানিয়ে বাংলাদেশ ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থপনা সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু জাগো নিউজকে বলেন, পাথরঘাটার পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙা শিল্পটি এখন বরগুনার তালতলীতে স্থাপন করা হবে। এজন্য ইতোমধ্যেই তালতলীর বঙ্গোপসাগরের মোহনার গভীরতা পরিমাপ করা হয়েছে।পায়রা সমুদ্র বন্দর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের দাবি আনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী পায়রা নদীতে পায়রা বন্দর নির্মাণের ঘোষণা দেন। কিন্তু একটি মহল প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে সেটিকে অন্যত্র নিয়ে যায়। এ বিষয়টি তিনি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তুলে ধরেছেন বলে জানান। আর পায়রা সেতু না হওয়ার বিষয়টি এখনো অবগত নন বলে জানান। সেনানিবাস সম্পর্কে তিনি বলেন, সেনানিবাস স্থাপনের জন্য নির্ধারিত স্থানের আশেপাশের বান্দিাদের অসহযোগিতার কারণে বরগুনায় সেনানিবাস নির্মিত হয়নি। তবে সেটি স্থাপনের জন্য এখনো পর্যন্ত বরিশালের কোনো স্থান নির্বাচন করা হয়নি। এসএস/এবিএস