দেশজুড়ে

জুলিয়েট ও পিলপিলের ঘরে ফুটেছে ৪৭টি বাচ্চা

সুন্দরবন করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রের কুমির জুলিয়েট ও পিলপিলের ডিম থেকে এবার ৪৭টি বাচ্চা ফুটেছে। রোববার সকালে বাগেরহাটের সুন্দরবন করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রে একে একে ডিম থেকে এ বাচ্চাগুলো বেরিয়ে আসে। তবে এ সময় ৫১টি ডিম নষ্ট হয়। কুমির প্রজনন কেন্দ্রের ইনচার্জ জাকির হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।জাকির হোসেন বলেন, গত ১২ মে কুমির প্রজনন কেন্দ্রর মা কুমির জুলিয়েট ৫০টি ও পিলপিল ৪৮টি ডিম দেয়। এরপর থেকে নিবিড় তত্ত্বাবধানের ফলে রোববার সকাল থেকে সংগ্রহ করা ডিম থেকে একে একে বাচ্চা ফুটতে শুরু করে। বিলা ১১টার মধ্যে সর্বমোট ৪৭টি বাচ্চা ডিম থেকে বের হয়। অন্য ৫১টি ডিম নষ্ট হয়েছে। ভ্রূণের মৃত্যু ও অনিষিক্ত হওয়ায় কারণে ওই ৫১টি ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়নি বলে তিনি জানান। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব, প্রাকৃতিক ও মানুষের অত্যচারের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য মানগ্রোভ সুন্দরবন থেকে ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে বেশ কয়েক প্রজাতির কুমির। বিলুপ্তির পথে রয়েছে আরও কয়েক প্রজাতির কুমির। কুমিরের বিলুপ্তি ঠেকাতে সরকারিভাবে সুন্দরবনের করমজলে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের একমাত্র হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন  সুন্দরবনের (বাংলাদেশ অংশে) আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার। যার স্থল ভাগের পরিমাণ ৪ হাজার ১ শত ৪৩ বর্গ কিলোমিটার এবং জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮শত ৭৩ বর্গ কিলোমিটার। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব, মিষ্টি পানির উৎস বন্ধের কারণে লবনাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূলতায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র হুমকির মুখে। দিন দিন কমছে বনের পরিমাণ, হারিয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতির পশু-পাখি। বেশ কিছু বছর আগেও সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীর তীরে কুমিরের বিচরণ চোখে পড়লেও এখন সুন্দরবনে ঘুরতে গিয়ে পর্যটকদের চোখে কুমিরের দেখা মেলা বড়ই ভাগ্যের ব্যাপার। এ অবস্থায় সুন্দরবন থেকে কুমিরের বিলুপ্তি ঠেকাতে সরকারিভাবে ২০০২ সালে বাগেরহাট জেলার অন্তর্গত পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজলে প্রতিষ্ঠা করা হয় দেশের একমাত্র হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তেমন কোনো ঝামেলা ছাড়াই এ কেন্দ্রে হরিণের সংখ্যা স্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেলেও কুমির উৎপাদন শুরু হয় ৩ বছর পর ২০০৫ সালে। এ পর্যন্ত এ কুমির প্রজনন কেন্দ্রে ৪শর অধিক বাচ্চা উৎপাদিত হয়েছে। যার ৭২টি বড় কুমিরের বাচ্চা সুন্দুরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরও ৫টি কুমির চট্রগ্রামের ডুলহাজরা সাফারি পার্কে এবং ৩টি পটুয়াখালীতে পাঠানো  হয়েছে। করমজন প্রজনন কেন্দ্রটি যার নিবীড় ছোয়ায় এ গৌরবময় অবস্থানে পৌঁছেছে তিনি হলেন করমজল হরিন ও কুমির প্রজনন কেন্দ্রের সাবেক ফরেস্ট অফিসার ও কুমির বিশেষজ্ঞ আব্দুর রব। এই কুমির বিশেষজ্ঞের মতে, কুমির উৎপাদনের (২০০৫ থেকে ২০১৬) পর থেকে গত ১১ বছরের এই কেন্দ্র থেকে যে হারে কুমির উৎপাদন হয়েছে তা সুন্দরবনের অবমুক্তির জন্য সামন্য। এক প্রকার বলা চলে এটি প্রাথমিক পর্যায়ের অবস্থা। তারপরও এ কেন্দ্রের উৎপাদিত কুমির সুন্দরবনে কুমিরের বিলুপ্তি ঠেকাতে বিশেষ অবদান রাখছে। তিনি বলেন, সুন্দরবনে কুমিরের সংখ্যা কমার পিছনে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে, মানুষের অত্যচার ও প্রাকৃতিক কারণ। কুমির সাধারণত মে -জুন মাসে ডিম পাড়ে। আগস্ট সেপ্টম্বরে সুন্দরবনে পানি বৃদ্ধি পেলে অধিকাংশ  ডিম নস্ট হয়ে বাচ্চা মারা যায়। এছাড়া প্রকৃতিগত ভাবেই বড় কুমির ছোট কুমিরকে খেয়ে ফেলে। পুরুষ কুমিরের ডিম খেয়ে ফেলার স্বভাবগত আচরণের ফলে কুমিরের সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম কারণ।এছাড়া কুমির যেহেতু মাছ খায় তাই জেলেদের কাছে কুমির শত্রু হিসেবে পরিচিত হওয়ায় জালে কুমির আটকা পড়লে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে জেলেরা।কুমির নিয়ে ১ যুগেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা করা করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রের সাবেক ফরেস্টার আব্দুর রব দাবি করেন সুন্দরবনে প্রাকৃতিক থ্রেট ও হিউম্যান থ্রেট ওভারকাম করা গেলেই কুমিরের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে করমজল হরিন ও কুমির প্রজনন কেন্দ্রে প্রজননক্ষম নোনা পানির দুটি নারী কুমির জুলিয়েট ও পিলপিল এবং একটি পুরুষ কুমির রোমিও রয়েছে। ২০০৫ সাল থেকে গত ১১ বছরে জুলিয়েট ও পিলপিলের ৭২৩টি ডিম থেকে ৪৩৯টি বাচ্চা ফুটেছে।বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে তিন প্রজাতির কুমিরের অস্তিত্ব ছিল। লবণ পানির কুমির, মিঠা পানির কুমির ও গঙ্গোত্রীয় কুমির বা ঘড়িয়াল। এর মধ্যে মিঠা পানির কুমির ও ঘড়িয়ালের বিলুপ্তি ঘটেছে। এখন শুধু লবণ পানির কুমিরের অস্তিত্বই সুন্দরবনে টিকে আছে। এরা সাধারণত ৮০ থেকে ১শ বছর বেছে থাকার মেয়াদে ৬০/৬৫ বছর পর্যন্ত দিম দেয়। এফএ/এবিএস