জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিকট স্বজন হারানোর মতোই মানুষের জন্য অঝোরে কাঁদতে দেখেছি। ৪৪ বছর আগে মানুষের জন্য তার এই কান্না আজও স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। সেদিন বুঝেছি বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষকে কতটা ভালোবেসেছিলেন। কথাগুলো আবেগাপ্লুত হয়ে বলছিলেন ঝালকাঠির চারণ সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব মানিক রায়। আবেগ জড়িত কণ্ঠে মানিক রায় বলেন, আমি তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সারা দেশ ঘুরে দেখার কর্মসূচি নিয়ে বের হয়েছিলেন। ঝালকাঠি তখন একটি থানা। বঙ্গবন্ধু খুলনা হয়ে ঝালকাঠি আসবেন। তিনি কখন আসবেন, তাকে কখন দেখব? সকাল থেকে খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে প্রতীক্ষায় প্রহর গুণছিলাম।সৌম্য দৃপ্ত নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেষ বিকেলে ‘ফাউন্ডার পথ’ নামে বিআইডব্লিউটি এর একটি জাহাজে করে ঝালকাঠি এলেন। তৎকালীন সময় সড়ক পথের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। মানুষের চলাচলের জন্য একমাত্র নৌপথই ছিল। ঝালকাঠি পৌরসভার সামনে সুগন্ধা নদীর তীরে বধ্যভূমি। এখানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত কয়েক হাজার নিরীহ মানুষকে গুলি করে পাকবাহিনী হত্যা করে। সংখ্যালঘুসহ নিরীহ মানুষদের ধরে এনে থানায় রাখা হতো এবং পরদিন ভোরে ৪ জন করে হাত পেছনে বেঁধে নদী পাড়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো। এই বধ্যভূমিতে একদিনেই সর্বোচ্চ ১৯৬ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই স্থানটি সুগন্ধা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় এবং তা বর্তমান নদীর মধ্যবর্তী অংশে রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, এখানে নদীপাড়ে বধ্যভূমি সংলগ্ন একটি উঁচু মাটির টিলা ছিল। বঙ্গবন্ধু বধ্যভূমিতে নামলেন। তখন সেখানে সুগন্ধা নদীর তীব্র ভাঙন কবলিত। বধ্যভূমির অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শহীদদের মাথার খুলি ও শরীরের হাড়। বঙ্গবন্ধু যখন এলেন সেখানে ৪-৫ জন পুলিশ দেখেছি, তবে বঙ্গবন্ধু তাদের দূরে থাকতে বলেছিলেন। যাতে মানুষ তার কাছে আসতে কোনো বাধা না পায়। বঙ্গবন্ধু এখানে এসে মানুষকে হত্যা করার পর লাশ কি করা হতো জানতে চান। তৎকালীন সুইপার সরদারদের মধ্যে জহর লালের কাছে জানতে চাওয়া হলে জহর লাল জানান, ৪-৫ জন তার বয়সী তরুণ সুইপার নিয়ে কোনো রকম গর্ত করে এক সঙ্গে লাশগুলো পুঁতে দেয়া হতো। পরে দিন কুকুর এবং রাতের বেলা শেয়াল শহীদের মরদেহ ছিঁড়ে খেত। বঙ্গবন্ধু তখন হঠাৎ করে টিলার ওপর বসে পরেন এবং ১০ মিনিট ধরে কাঁদেন। তার অঝোর ধারার কান্নায় চোখের পানিতে পাঞ্জাবি ভিজে যায়। সেখানে উপস্থিত আমির হোসেন আমু (বর্তমান শিল্পমন্ত্রী), নুরুল ইসলাম খলিফাসহ অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশ দিলেন ‘নদীর ভাঙনে বধ্যভূমিটি বিলীন হয়ে যবে। সরকারের পক্ষে এই মুহূর্তে ভাঙন রক্ষায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্ভব হবে না। তোমরা এখান থেকে শহীদদের কঙ্কালের অংশ নিয়ে নিরাপদ স্থানে স্মৃতি রক্ষার্থে ব্যবস্থা করো। তবে কাজটি স্থানীয়ভাবে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে করতে হবে। সরকারিভাবে অর্থ বরাদ্দের অপেক্ষায় বসে থাকা যাবে না। বঙ্গবন্ধু সেখান থেকে কিছু মাথার খুলি ঢাকার যাদু ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য জাহাজে বস্তা ভরে নিয়ে যান। এরপর সেখান থেকে কিছু দূরে কঙ্কালের অংশ নিয়ে বর্তমান সিটি পার্ক এলাকায় শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। আর ৮ বছর আগে বর্তমান শহীদ মিনারটি পৌরসভা কর্তৃক সংস্কার করা হয়। বঙ্গবন্ধু প্রেমিক মানিক রায় বলেন, আজও বঙ্গবন্ধুর ছবি যখন দেখি, অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি, আর মনে মনে ভাবি বাংলাদেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে আপন জন হিসেবে আর কেউ কখনো ভালোবেসেছিল কিনা? এসএস/পিআর