নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার গণকবরগুলো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজাকারদের সহযোগিতায় বিভিন্ন সময় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডবলীলা চালিয়ে হত্যা করেছিল নিরপরাধ কৃষক, শ্রমিক এবং চাকরিজীবিসহ সাধারণ মানুষকে। সম্ভ্রমহানী করেছিল অনেক মা বোনদের। মুক্তিযোদ্ধাসহ নিহতদেরকে উপজেলার বান্দাইখাড়া, সিংসাড়া, পুরাতন রেলওয়ে স্টেশন, বাউল্যাপাড়া, পাইকড়া, গোয়ালবাড়ী ও মিরাপুর নামক স্থানে গণকবর দেওয়া হয়। গণকবরে শায়িতদের স্মৃতির ফলকে নামের তালিকা তৈরি করা হয়। স্মৃতিফলকে তাকালে মনে দেয় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের কথা। বর্তমান প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেই দিনগুলোর কথা। এতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ পাচ্ছে এলাকার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের মনে। নতুন প্রজন্মকে করছে দেশগড়ার কাজে প্রত্যয়ী। এসব গণকবরের জমি এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। মুক্তিযুদ্ধের এই স্মৃতিগুলো সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা না হলে দিনকে দিন হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।আত্রাই মুক্তিযোদ্ধা অফিস সূত্রে জানা যায়, বান্দাইখাড়া বধ্যভূমিতে ৩৯ শতক জমিতে প্রায় ৫৮ জন, সিংসাড়াতে ০৭ শতক জমিতে প্রায় ২৯ জন, বাউল্যাপাড়ায় ২৭ শতক জমিতে প্রায় ১৩ জন, পাইকড়ায় ২৮ শতক জমিতে প্রায় ১৩ জন, গোয়ালবাড়ীতে ৩ শতক জমিতে সাত জন, মিরাপুরে ২৫ শতক জমিতে প্রায় ৩০ জন শহীদদেরকে গণকবর দেওয়া হয়। পুরাতন রেলওয়ে স্টেশনে রয়েছে ৫০ শতক জমি। তবে কতজনকে মানুষকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে তা জানা সম্ভব হয়নি।জানা যায়, দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রাজাকারদের সহযোগিতায় তাণ্ডবলীলা চালায় পাকিস্তানি আলবদররা। এসময় বিভিন্ন গ্রামের শত শত নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাকিস্তান বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দালালদের সেই বর্বর হত্যাকাণ্ড থেকে বাদ যায়নি এলাকার স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই গণকবরগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয় ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে কিছু স্মৃতিফলক তৈরি করা হলেও সরকারিভাবে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।মোলা আজাদ মেমোরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র শরিফুল বলেন, বিশ্বের ইতিহাসে বর্বরোচিত ঘটনা ১৯৭১ সালে নিরীহ বাঙালিদের উপর তাণ্ডব চালানো সেই ঘটনাগুলো যদি বই থেকে পড়া হয় গায়ের লোম শিউরে উঠে। বধ্যভূমিগুলোতে গেলে কল্পনায় যেন ১৯৭১ সালে ফিরে যাই। শিক্ষার্থী জান্নাতুন, ফেরদৌসি, সোহেল, আসফাক বলেন, বধ্যভূমিগুলো একদিকে যেমন ১৯৭১ সালের স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের মানুষের কাছে তুলে ধরছে; তেমনি তাদের আহ্বান করছে সেই স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে দেশকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে।সমশের উদ্দিন জানান, অনেক বধ্যভূমিতে কোন প্রাচীর নেই। স্থানীয় উদ্যোগে কিছু স্মৃতিফলক তৈরি করা হয়েছে এবং নিজ উদ্যোগে দিবসগুলোতে দোয়া ও মিলাদ করা হয়। বধ্যভূমির স্থানগুলো প্রাচীর ও স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করা এবং দিবসগুলো সরকারি উদ্যোগে পালন করার দাবি জানান। ‘একুশে পরিষদ নওগাঁ’ একটি সামাজিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এমএম রাসেল বলেন, আত্রাইয়ে বধ্যভূমিগুলো খুবই অরক্ষিত। এখনো অনেক বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়নি। একুশে পরিষদের উদ্যোগে কয়েকটি বদ্ধভূমিতে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয়রা তাদের নিজেদের চেষ্টায় দিবসগুলো পালন করে। আত্রাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আখতারুজ্জামান বলেন, গণকবরের জমিগুলো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা আশু প্রয়োজন। কেননা এসব স্মৃতি নষ্ট হলে নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস অজানা রয়ে যাবে। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড হারুন অল রশিদ জানান, জেলার যেখানে বধ্যভূমি আছে সেগুলোতে আমরা প্রাচীর ও স্মৃতিফলক করার জন্য চেষ্টায় আছি।আব্বাস আলী/এআরএস