দেশজুড়ে

বেনাপোল রেলস্টেশনের ভবন নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী

৪৩ বছর পর বাংলাদেশ-ভারতে চলাচলকারী খুলনা-বেনাপোল-কলকাতা রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর জন্য দুই কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বেনাপোল আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও জিআরপি ভবন নির্মাণকাজে অতি নিম্নমানের খোয়া এবং বালু ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নজর না দিলে পরবর্তী সময়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তবে রেলওয়ে বিভাগের প্রকৌশলীদের দাবি, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের সামগ্রী আনলেও, তারা সেসব ব্যবহার করবে না। কিন্তু তাদের চোখের সামনেই এসব সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে।১ জানুয়ারি থেকে ‘দ্বিতীয় মৈত্রী এক্সপ্রেস’ নামে এই  যাত্রীবাহী ট্রেন দুই দেশের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এ সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে কিনা- তা নিয়ে সংশয় রয়েছে সবার মাঝে। খুলনা-বেনাপোল-কলকাতা রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলে বেনাপোলের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সংস্কার উদ্দেশ্যে গত ৩ নভেম্বর বেনাপোল রেলস্টেশন ভবনে কাস্টমস, বন্দর ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান। এর আগে গত ১৯ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বেনাপোল রেলস্টেশন পরিদর্শন করেন। বেনাপোল রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তিনটি নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে কাস্টমস ভবন নির্মাণকাজ করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ঢাকার আফজাল এন্টারপ্রাইজ, ইমিগ্রেশন ভবনের কাজ করছে ঢাকার বেল্লাল এন্টারপ্রাইজ ও জিআরপি ব্যারাক নির্মাণ করছে ঢাকার বুলবুল এন্টারপ্রাইজ। নির্মাণকাজে বেল্লাল এন্টারপ্রাইজ ও আফজাল এন্টারপ্রাইজের কাজে মারাত্মক অনিয়ম রয়েছে। রেলের প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ট্রাক ও ট্রলিতে করে নিম্নমানের বালু, ভাঙা এবং তিন নম্বর ইট এনে খোয়া তৈরি ও ব্যবহার করছে। কিন্তু ঠিকাদারের সহযোগী ও প্রভাবশালীদের ভয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা মুখ খুলতে পারছেন না।এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্টেশন অফিসার (সিনিয়র উপসহকারী প্রকৌশলী) চাঁদ আহম্মদ প্রথমে অনিয়মের কথা অস্বীকার করেন। পরে ছবি দেখালে তিনি বলেন, নিম্নমানের খোয়া আনলেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, ঢালাই কাজে ভালো খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তার নমুনা দেখাতে পারেননি তিনি।রেলের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কীভাবে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহৃত হচ্ছে, তারও কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।রেলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী বীরবল মণ্ডল জানান, তিনটি ভবন নির্মাণে বরাদ্দ রয়েছে দুই কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইমিগ্রেশন ভবন নির্মাণে এক কোটি, কাস্টমস ভবন নির্মাণে এক কোটি ও জিআরপি ব্যারাক নির্মাণে ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের কাজ শেষ করার নির্দেশ রয়েছে। ট্রেনটি চলাচলের জন্য ভারত অংশে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। নতুন নির্মাণাধীন এসব ভবনে ওই ট্রেনের যাত্রীদের পাসপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।সূত্র জানায়, ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব সুদৃঢ় করতে আগামী জানুয়ারিতে খুলনা-বেনাপোল-কলকাতা রুটে ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত হয়। শুরুতে একটি ট্রেন সপ্তাহে একবার খুলনা থেকে বেনাপোল হয়ে কলকাতা গিয়ে ফিরে আসবে। এর ফলে চার ঘণ্টার মধ্যে ব্যবসায়ী, পর্যটক, রোগী কলকাতায় পৌঁছাতে পারবেন। আমদানি-রফতানি বাণিজ্যেও সম্প্রসারণ ঘটবে। বর্তমানে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মালবাহী ট্রেন চলছে। ১৮৬৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম এ রুটটি চালু হয়। রেলপথে কলকাতা থেকে খুলনার দূরত্ব ১০৯ মাইল। ১৯৭৪ সালে লোকসানের কবলে পড়ে তা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিএনপি সরকার রেলপথটি বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করে। যশোরসহ স্থানীয় মানুষের আন্দোলনের ফলে রেলপথটি বন্ধ করতে পারেনি তৎকালীন সরকার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও ভারতের তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দরে যৌথভাবে পণ্য পরিবহন রেলপথ উদ্বোধন করেন। সেই থেকে এখনো চলছে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেন। দীর্ঘ ৪৩ বছর পর আবারও খুলনা-কলকাতার মধ্যে সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে।জামাল হোসেন/এফএ/আরআইপি