দেশজুড়ে

প্রকৃতির হাতছানিতে রাঙামাটি ছুটছেন পর্যটকরা

ভোরের কুয়াশা আর হিমেল হওয়া বার্তা দিচ্ছে শীত এসেছে। এই শীতেই প্রকৃতির হাতছানিতে প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে বের হন ভ্রমণপিপাসুরা। তাই পাহাড়, হ্রদ আর ঝরনার টানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙামাটিতে ছুটছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। প্রায় তিন মাসেরও অধিক সময় কাপ্তাই লেকে ডুবে থাকার পর জেগে উঠেছে রাঙামাটির মনোরম ঝুলন্ত সেতু। হাঁটা-চলার জন্য ফের স্বাভাবিক হয়েছে সেতুটি। কাছে টানছে ভ্রমণপিপাসু ও দর্শনার্থীদের। রাঙামাটি পর্যটন মোটেল ও হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, সেতুটি হাঁটা-চলার জন্য এখন আগের মতোই স্বাভাবিক। বর্তমানে সেতুটি লেকের পানির লেভেল থেকে প্রায় তিন ফুট ওপরে। মৌসুমের শুরুতেই আশানুরূপ পর্যটক আসছেন। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে কাপ্তাই লেকে পানি বাড়ায় গত প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে ঝুলন্ত সেতুটি পানিতে তলিয়ে ছিল। বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হ্রদের পানি কমতে শুরু করে। ফলে সেতুটি আবার সচল হয়েছে। এলোমেলো সারিতে সাজানো উঁচু-নিচু ছোটবড় অসংখ্য পাহাড়ের সমাবেশ রাঙামাটিতে। চোখ মেলে তাকালেই আকাশছোঁয়া পাহাড়। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে চোখ জুড়ানো আঁকাবাঁকা কাপ্তাই লেক। সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে অসংখ্য পাহাড়ি ঝরনাধারা। অবিরাম হাতছানি কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ পানি আর বিস্তীর্ণ সবুজ পাহাড়ের। নৈসর্গিক লীলাভূমি পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি যেন শিল্পীর আঁকা জীবন্ত ছবি।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কর্মব্যস্ততার ফাঁকে এখন অনেকে ছুটছেন নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটিতে। প্রতিদিন বাড়ছে পর্যটকদের ভিড়। পর্যটকদের পদচারণায় মুখর এ পাহাড়ি জনপদ। শুক্র ও শনিবারসহ সরকারি ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের পদচারণায় পর্যটন স্পটগুলোয় বাড়ছে কোলাহল। প্রতিনিয়ত পর্যটকদের কাছে টানছে কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ জলধারা। রাঙামাটি পর্যটন মোটেল ও হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, রাঙামাটির পর্যটন মোটেলে এখন পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়। ইতোমধ্যে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোটেলে অর্ধেক কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। কটেজগুলোতেও বুকিং আছে। আয় বেড়েছে সেখানকার পর্যটন খাতে। ১৯৬০ সালে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর ওপর দিয়ে কাপ্তাইয়ে বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্টি হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলরাশি কাপ্তাই লেক। যার আয়তন প্রায় সাড়ে ৭০০ বর্গকিলোমিটার। এই কাপ্তাই লেক ঘিরে গড়ে ওঠে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ জলাধারায় নৌ-ভ্রমণে-রোমাঞ্চকর আনন্দ উপভোগ করতে প্রতিনিয়ত ঘুরতে যান দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। পর্যটকদের নিরাপত্তায় আশপাশে সার্বক্ষণিক নৌ পুলিশের টহল জোরদার থাকে বলে জানায় রাঙামাটির পর্যটন কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত পার্বত্য জেলা রাঙামাটির উত্তরে খাগড়াছড়ি জেলা, দক্ষিণে বান্দরবান, পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য আর পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা। জেলার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা পাহাড়ি কন্যা কর্ণফুলী নদী সরাসরি মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। যদিও তা কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে কাপ্তাই বাঁধ। কর্ণফুলীর উৎপত্তি ভারতের মিজোরাম রাজ্যের লুসাই পাহাড় থেকে। এছাড়াও কর্ণফুলী ঘিরে উৎপত্তি হয়েছে চেঙ্গী, মাইনি, কাচালং, সুবলং, রাইংখিয়ং, বরকল, হরিণা নদী। তবে এগুলো মিলিয়ে গেছে কাপ্তাই লেকে। চারদিকে লেক পরিবেষ্টিত রাঙামাটি জেলা সবুজ বন ও পাহাড়ে ঘেরা। পাহাড়, বন আর স্বচ্ছ জলধারায় রাঙামাটির নৈসর্গিক আবেশ। জেলাজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দর্শনীয় ও উপভোগ্য স্থান। প্রকৃতি মেলেছে উদারতার দু’হাত। রাঙামাটির মূল শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের হলিডে কমপ্লেক্সের অবস্থান। সেখানেই নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিকাড়া ঝুলন্ত সেতুটি, যার পরিচিতি দেশে-বিদেশে। এ পর্যটন কমপ্লেক্সে মনোরম সেতু ছাড়াও রয়েছে কটেজ ও মোটেল। কাপ্তাই লেকে নৌ ভ্রমণের জন্য রয়েছে- স্পিডবোট, প্যাডলবোট ও ইঞ্জিনবোটের সুবিধা। সড়ক পথে যাতায়াতে রয়েছে গাড়ির ব্যবস্থা। শহর থেকে চার কিলোমিটার পূর্বে বালুখালীতে গড়ে তোলা হয়েছে সরকারি কৃষি বিভাগের কৃষিফার্ম, বেসরকারি পর্যটন স্পট টুকটুক ইকোভিলেজ, পেদাটিংটিং ও চাংপাং রেস্টুরেন্ট। প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার নদীপথে দূরত্বে জেলার বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়নে অবস্থিত মনোরম সুবলং ঝরনা স্পট। শহরের উত্তরে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাটে স্থাপিত হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের স্মৃতিসৌধ। এসব স্থাপনায় যেতে হলে রিজার্ভ করে নিতে হয় স্পিডবোট অথবা ইঞ্জিনবোট।  জেলা সদরেই রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের উভয়পাশে সাপছড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। মূল শহরে সংযুক্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশের প্রধান বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রাজবন বিহার। পাশে কাপ্তাই লেক পরিবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন রাজদ্বীপে অবস্থিত চাকমা রাজার বাড়ি। কাপ্তাই লেক ঘেঁষে শহরের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মনোরম ডিসি বাংলো। পাশে গড়ে তোলা হয়েছে জেলা পুলিশের একটি বিনোদন স্পট। রাঙাপানির হ্যাচারি এলাকায় স্থাপিত হয়েছে সুখী নীলগঞ্জ স্পট। এছাড়া বরকল, হরিণা, ঠেগামুখ সীমান্ত, মাইনি, কাচালং, সাজেক ভেলিতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বহু স্থান। রাঙামাটির প্রবেশমুখে কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়ায় রয়েছে ঠাণ্ডাছড়ি চা বাগান, উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র, কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ কল কেপিএম, কাপ্তাই বাঁধ, জাতীয় উদ্যান, নেভিক্যাম্প, জুম প্যানোরমা স্পট, শিলছড়ি বনানী পর্যটন স্পট, চিৎমরম বৌদ্ধ বিহারসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও স্থাপনা।আরএআর/এনএইচ/এমএস