দেশজুড়ে

নেত্রকোনা ট্র্যাজেডি দিবস আজ

দেখতে দেখতে পেড়িয়ে গেছে ১১টি বছর। এখানো শোকে কাতর নেত্রকোনা জেলার সর্বস্তরের সাংস্কৃতিক কর্মীরা। যখন অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা নিয়ে সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা জাতীর সামনে তুলে ধরছিল সংস্কৃতি কর্মীরা। প্রস্তুতি নিচ্ছিল পরদিন নেত্রকোনা মুক্তদিবসের অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনের ঠিক তখনি ২০০৫ সালের ৮ ডিসেম্বের বিজয়ের মাসেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে হত্যা করতে এক দল সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তাদের উপর পরিকল্পিত হামলা চালায়। শহরের অজহর রোডস্থ উদীচী ও শতদল শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ের সামনে একটি বোমা ফেলে রাখে দুর্বৃত্তরা। এ খবর শহরে ছড়িয়ে পড়লে উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে ভীড় করে। এ সময় উৎসুক জনতার ভীরে জেএমবির একজন আত্মঘাতি সদস্য সাইকেল যোগে ঘটনাস্থলে এসে আকস্মিক বোমা হামলা চালায়। এসময় হামলাকারীসহ নেত্রকোনা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক খাজা হায়দার, সাংগঠনিক সম্পাদক সুদীপ্তা পাল শেলী , ও মোটর মেকানিক যাদব দাসসহ আটজন নিহত হয়। এ হামলায় কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়।এ ঘটনা নিয়ে ওই সময় সারাদেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বোমা হামলার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তখনো একটি স্থানীয় কুচক্রি মহল সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের কাছে প্রিয় পাত্র থাকার জন্য মোটর মেকানিক যাদবকে হিন্দু জঙ্গি ‘নিউ ডাইমেনশন’ হিসেবে প্রমাণিত করতে চেষ্টা চালায়। কিন্তু নেত্রকোনা সচেতন নাগরিকরা সম্মিলিতভাবে এর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং জেএমবির সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণ করেন। তৎকালীন সময়ের এই আলোচিত ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ ব্যাক্তিবর্গ ঘটনাস্থল ও আহত-নিহতের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। কিন্তু পরবর্তীতে ঘটনার ১১বছর পেরিয়ে গেলেও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সরকার বা কোনো বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পায়নি। এমনকি সরকারি কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেসব পরিবারের নিকট এখন আর সান্তনার বাণী শুনাতেও আর আসেননি। ফলে চরম হতাশা বিরাজ করছে এসব পরিবার গুলোর মাঝে।এ ঘটনায়  ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় দ্রুত বিচার আদালত-২ এই বোমা হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে সালাউদ্দিন, আসাদুজ্জামান এবং ইউনূস নামে তিন জেএমবির সক্রিয় সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও আজ পর্যন্ত তাদের গ্রেফতার করে ফাঁসির রায় কার্যকর হয়নি। ফলে এখনো প্রতিনিয়ত আতঙ্ক নিয়েই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে তুলে ধরতে কাজ করছে সাংস্কৃতিক কর্মীরা। এদিকে, নেত্রকোনাবাসী জেএমবির স্থানীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের খুঁজে বের করে শাস্তির জানালেও ঘটনার অন্তরালে স্থানীয়ভাবে কারা মদদ দিয়েছিল তাদের এখনো চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিটিকে হারিয়ে অনেকের পরিবারের সদস্যরা আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছে। অসুস্থদের চিকিৎসা করারও সক্ষমতা নেই। খাজা হায়দারের পরিবারের বড়ই করুণ অবস্থা এখন।নিহত খাজা হায়দারের স্ত্রী শাহানাজ বেগম জাগো নিউজকে বলেন, দুঃখের বোঝা আরও ভারি করতে আপনারা শুধু এই দিনটি এলেই আমাদের কাছে আসেন। কই মৃত্যুর পর কীভাবে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে আছি তার খবর তো কেই নিতে আসেননি। সন্তানদের লেখাপড়া কীভাবে হচ্ছে না হচ্ছে না তাও তো কেউ কোনো দিন জানতে চায়নি। আমি আর এই দিনটির কথা স্মরণ করতে চাই না। যা হারিয়েছি তার কষ্ট শুধু আমিই জানি তা কত যন্ত্রণার।এ ব্যাপারে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি মোজ্জাম্মেল হক বাচ্চু জাগো নিউজকে জানান, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সাহায্য ও জেএমবির সদস্যদের নেত্রকোনায় আশ্রয় প্রশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য সরকারের নিকট বারবার দাবি জানিয়ে আসছি কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। আমি চাই বর্তমান সরকার একটি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক সরকার এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে আর্থিক সাহায্য করবেন এবং স্থানীয় মদদদাতাদের খুঁজে বের করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেবেন।স্থানীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে জানিয়ে নেত্রকোনা পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী জাগো নিউজকে জানান, আদালত যদি ঘটনার অধিকতর তদন্ত দাবি করেন তাহলে আমরা সে মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।৮ ডিসেম্বর উপলক্ষে জেলা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- দলীয় কার্যালয়ে প্রভাতে সাংগঠনিক ও কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাচ ধারণ, শোক র্যা লি, ৫ মিনিট স্তব্দ নেত্রকোনাবাসী, স্মৃতি ফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভা। আরএআর/আরআইপি