ড্রেজিং না হওয়ায় কাপ্তাই হ্রদ ঘিরে ক্রমেই সংকট বাড়ছে। সদ্য বর্ষা শেষে হ্রদে পানি কমতে শুরু করেছে। প্রতি বছর শুস্ক মৌসুমে নৌ-পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট বাড়ে। এ নিয়ে বিপাকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। সাধারণত অক্টোবর মাসের পরে তেমন কোনও বৃষ্টিপাত না হওয়ায় হ্রদের রিজার্ভ (সংরক্ষিত) পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ছাড়তে হয়। আবার চাষাবাদের জন্যও হ্রদে প্রচুর পানি ধরে রাখা সম্ভব হয় না। সব মিলিয়ে চৈত্রের পর থেকেই পানি কমে যাওয়া ও হ্রদে প্রচুর পলির কারণে রাঙামাটির সঙ্গে উপজেলাগুলোর নৌপথে যোগাযোগে সমস্যা তৈরি হয়। জানা যায়, দিনদিন কাপ্তাই হ্রদের তলদেশ ভরাট হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে অস্বাভাবিক হারে পানি কমে যায়। এতে হ্রদজুড়ে জেগে ওঠে অসংখ্য ডুবোচর আর মাঠ। ফলে বিঘ্ন ঘটে নৌযান চলাচলে। সৃষ্টি হয় নৌপরিবহন সংকট। আর বর্ষা মৌসুমে অস্বাভাবিক হারে হ্রদে পানির উচ্চতা বাড়ে। ফলে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েন হ্রদের তীরবর্তী এলাকার লোকজন। তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। এতে চরম জনদুর্ভোগ বাড়ে। প্রসঙ্গত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১৯৬০ সালে রাঙামাটি জেলার কাপ্তাইয়ে খরস্রোতা কর্ণফুলি নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে সৃষ্টি হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলরাশি কাপ্তাই হ্রদ। হ্রদটি সৃষ্টির ৫৬ বছরে একবারও ড্রেজিং না হওয়ায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে হ্রদের তলদেশ। এছাড়া প্রতিনিয়ত দখলের কবলে পড়ছে হ্রদের তীরবর্তী এলাকা। লেকের পাড় দখল করে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা। এতে লেক ঘিরে তৈরি হচ্ছে নানা ঝুঁকি ও সংকট। পরিবেশের ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। আর বর্জ্য পড়ে দুষণের শিকার হচ্ছে হ্রদের পানি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রেজিং না হওয়ায় কাপ্তাই হ্রদ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দূষণের শিকার হচ্ছে হ্রদের পানি। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সরকার এখনও উদাসীন। ড্রেজিংয়ের কথা বলা হলেও আজও উদ্যোগ নেই। সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেন, কাপ্তাই লেকের তিন নদী কাচালং, কর্ণফুলি ও চেঙ্গি নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে এসব নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং হওয়া জরুরি।বিষয়টি স্বীকার করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নান বলেন, কাপ্তাই হ্রদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় গভীরতা অস্বাভাবিক পর্যায়ে কমে যাচ্ছে। ফলে নৌপরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নানা সংকট বাড়ছে। কাপ্তাই হ্রদের সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ড্রেজিংয়ের দরকার। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি অনুমোদনের জন্য বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।বিশ্লেষকদের মতে, বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই অস্বাভাবিক হারে হ্রদের পানির উচ্চতা বেড়ে যায়। ওই মৌসুমে রাঙামাটি জেলায় নিচু এলাকায় বসবাসকারী লোকজনের বাড়িঘরসহ ব্যাপক ফসলি জমি তলিয়ে যায়। এতে অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য হ্রদে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখতে বাধ্য হতে হয় কর্তৃপক্ষকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বছরের পর বছর পাহাড়ি ঢলে নামা পলি জমে হ্রদের তলদেশ ভরাট হয়ে গভীরতা কমছে। পাশাপাশি হ্রদের উভয় তীরে ভাঙন হচ্ছে। এতে প্রতিদিন কয়েক শ’ মেট্রিক টন বর্জ্য গিয়ে পড়ছে হ্রদে। ফলে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে কাপ্তাই হ্রদ। সংকট মোকাবেলায় হ্রদের পাঁচটি পয়েন্টে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পয়েন্টগুলো হল- রাঙ্গামাটি থেকে কাপ্তাই, মারিশ্যা (মাইনী ও কাচালং খাল), মহালছড়ি (চেঙ্গী খাল), ছোট হরিণা ও কাপ্তাই থেকে বিলাইছড়ি খাল।সুশীল প্রসাদ চাকমা/এএম/পিআর