দেশজুড়ে

নতুন রূপে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী মহাস্থানগড়

বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের চারিদিকে এখন সাজসাজ রব। এক বছরের জন্য মহাস্থানগড় হয়েছে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী। প্রায় আড়াই হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার নিদর্শন মহাস্থানগড়কে কেন্দ্র করে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানীর বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালা শুরু হবে আগামী ২১ জানুয়ারি। আগে এটি ছিল প্রাচীন বাংলার রাজধানী। যা পুন্ড্রুনগরী নামে পরিচিত ছিল। কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসা সেই দর্শনীয় স্থানটি এখন সেজেছে নতুন রূপে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থার (ইউনেসকো) সহযোগিতায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হচ্ছে মহাস্থানগড় এলাকা জুড়ে।সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর সার্ক সাংস্কৃতিক রাজধানী প্রসঙ্গে বলেন, নতুন বছরের শুরুতেই এই আয়োজন শুরু হচ্ছে। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরব।এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক নাহিদ সুলতানা বলেন, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে এই কাজটি আলাদা একটি ইউনিটের মাধ্যমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তদারকি করছে। পুরো মহাস্থানগড় এলাকার প্রাচীন নকশা ও এর আধুনিক অলংকরণ মিলিয়ে কাজটি চলছে। চলতি মাসের মধ্যেই কাজ শেষ হলে এগুলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে হন্তান্তর করা হবে। আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক এই স্থানে এসে সার্ক সাংস্কৃতিক রাজধানীর অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান মহাস্থানগড় পেয়েছে একটি নতুন চেহারা, যা দেখে পর্যটকরা আকৃষ্ট হবেন। সরেজমিনে ওই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মহাস্থানগড়ের প্রাচীন স্থাপনার দেয়ালগুলো যেখানে ভেঙে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে তা মেরামত করা হয়েছে সেই প্রাচীন কালের নকশার আদলে। এ জন্য প্রাচীন ইটের মতো করে ভাটা থেকে ইট তৈরি করা হয়েছে।প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রত্নতত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে বিশ্বে এ ধরনের কাজ স্বীকৃত। প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ সংস্কারে প্রাচীন ইট বানিয়ে তা মূল স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার কনজারভেশন আর্কিটেক্ট নিলাম করে তার সহযোগী ও শ্রীলঙ্কার রাজমিস্ত্রিদের নিয়ে কাজগুলো করছে।সম্প্রতি সচিবালয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সার্ক কালচারাল সেন্টারের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকেই বছর ব্যাপী অনুষ্ঠানমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২১ জানুয়ারি বগুড়ার মহাস্থানগড়েই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রত্ন-নাটকের মাধ্যমে মহাস্থানগড়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরা হবে। মহাস্থানগড়ের সাংস্কৃতিক ইতিহ্য ও বৈচিত্র নিয়ে থাকবে সেমিনার ও প্রদর্শনী। আয়োজন করা হবে লোক ও কারুশিল্প মেলা। আরও থাকবে রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর উপলক্ষে একটি প্রদর্শনী।সংস্কারকাজে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি প্রতিনিধি আব্দুল মালেক বলেন, মহাস্থানের নতুন রুপ দিতে ‘শুধু ইট-পাথর ও চুন-সুরকি নয়, বিশেষ ধরনের মেহগনি কাঠ ও টালি ব্যবহার করা হয়েছে, যা দেখতে অপরূপ। অনেকটা নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ঘরবাড়ির মতো। একটি বৃহৎ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের বেড়ানো, থাকা-খাওয়া ও কেনাকাটা করার জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে এখানে। ইতিমধ্যে কাজ প্রায় শেষ দিকে। জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানগুলো বছরব্যাপী এই আয়োজনের সঙ্গে মহাস্থানগড়েই উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে অমর একুশের বইমেলা, জাতীয় কবিতা উৎসব, একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন, পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব, স্বাধীনতা উৎসব, বাংলা নববর্ষ উদযাপন ইত্যাদি।এ ছাড়া সার্ক কবিতা উৎসব, আর্ট ক্যাম্প, সার্ক চলচ্চিত্র উৎসব, নাট্য উৎসব, নৃত্য উৎসব, খাদ্য উৎসব, হস্তশিল্প প্রদর্শনী প্রভৃতির আয়োজন করা হবে। এসব আয়োজনে যোগ দেবেন সার্কভুক্ত দেশগুলোর শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীরা।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘সার্ক সাংস্কৃতিক রাজধানী’ ঘোষণার জন্য প্রাথমিকভাবে বগুড়া, কুষ্টিয়া ও কুমিল্লা বিবেচনায় ছিল। শেষ পর্যন্ত বগুড়াকে বিবেচনায় নেয়ার কারণ বৌদ্ধ সভ্যতার প্রায় আড়াই হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল নিদর্শন মহাস্থানগড়। পাশাপাশি বগুড়ায় রয়েছে আরো অনেক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা, যা সব ধর্মের অনুসারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস-ঐতিহ্য ছাড়াও ঢাকা থেকে যাতায়াত, আবাসন, মিলনায়তন, আপ্যায়ন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় রেখেই বগুড়াকে বেছে নেয়া হয়েছে।এখন মহাস্থানগড় ঘিরে চলমান প্রকল্পটির নাম দেয়া হয়েছে, দক্ষিণ এশীয় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (এসএটিআইডিপি)। প্রায় ২০ রকমের এই কাজে উল্লেখযোগ্য হলো- কেনাকাটার জন্য মার্কেট, প্রবেশদ্বার, খাবারের দোকান, শৌচাগার, কাঠের ব্রিজ, পিকনিক স্পট, পার্কিং, রাস্তা কার্পেটিংসহ অন্যান্য। ২০১৪ সালের ১ এপ্রিল সরকারের সঙ্গে এই কাজটি করার জন্য এডিবির চুক্তি হয়। ১৫ মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে কাজের সময়সীমা বাড়ানো হয়। প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পে কাজের ব্যয় ধরা হয়েছিল ছয় কোটি ৬২ লাখ টাকা, পরে যা বাড়ানো হয়েছে। আরেকটি প্রকল্পে ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ রাস্তাঘাট নির্মাণ ও প্রাচীন ঐহিত্য সংরক্ষণের পুরনো নকশায় আধুনিক কাজ করা হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে এই কাজে ব্যয় হয়েছে ছয় কোটি ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। দ্বিতীয় এই কাজটির মেয়াদও এ বছর শেষ হচ্ছে।এসএটিআইডিপির পরিচালক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, শিগগির কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু জটিলতার কারণে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।সরকারি ভাবে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে দেশে পর্যটক আগমনের সংখ্যা বেড়ে যাবে। এ জন্য বিদেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে রেখে প্রচারের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে।আরএআর/এমএস