দেশজুড়ে

সুন্দরগঞ্জের বধ্যভূমি সংস্কারের উদ্যোগ নেই

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার গোয়ালের ঘাট বধ্যভূমিটি আযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এ বধ্যভূমিটি সংস্কার, সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও বধ্যভূমির নাম ফলকে শহীদদের নাম সংরক্ষণ না করায় নামগুলোও মুছে যেতে বসেছে।এদিকে, তিস্তা নদীর অব্যাহত ভাঙনের মুখে পড়েছে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বধ্যভূমি এলাকাটি। যে কোনো সময় বধ্যভূমির জায়গা তিস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় বধ্যভূমির জায়গাটি নদী ভাঙনের হাত থেকে দ্রুত রক্ষা, সংস্কার ও একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. লায়েক আলী খান মিন্টু জানান, ১৯৭১ সাল সারাদেশ যখন উত্তাল ঠিক তখন বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়। দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে ১০ ডিসেম্বর সুন্দরগঞ্জ উপজেলা চত্বরে স্বাধীনতার রক্তিম বিজয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সুন্দরগঞ্জ থানাকে হানাদার মুক্ত ঘোষণা করা হয়। সেই সময়ে শহীদদের গণকবর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্মরকচিহ্ন হয়ে থাকে গোয়ালের ঘাট বধ্যভূমিটি।  মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধ চলাকালে ভারতের দার্জিলিংয়ে ট্রেনিং শেষে ৬নং সেক্টর কমান্ডার মরহুম এয়ার ভাইস মার্শাল খাদেমুল বাশার ও কোম্পানি কমান্ডার শাহ নেওয়াজ এবং গাইবান্ধার দায়িত্বে নিয়োজিত ক্যাপ্টেন আজিজের নেতৃত্বে তারা যুদ্ধে অংশ নেন। দেশ স্বাধীনের জন্য তারা ভারত সীমানা অতিক্রম করে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারীতে পাক বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ করেন। এসময় ভূরুঙ্গামারীতে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মোকাবিলায় ২৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।মুক্তিযোদ্ধা মো. লায়েক আলী খান মিন্টু আরও জানান, সুন্দরগঞ্জ থানা হানাদার মুক্ত করার উদ্দেশ্যে মুক্তিযোদ্ধার প্লাটুন রওনা দিলে তিস্তা ব্রহ্মপুত্র নদী পার হওয়ার চেষ্টা করলে হানাদার বাহিনীর গুলিতে আব্দুল জলিল (ময়মনসিংহ) নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। হরিপুর এলাকা ওই দিনে শত্রু মুক্ত হয় এবং ১৮ জন রাজাকার মোজাহিদ অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেন। ৭ই ডিসেম্বর সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মাঠেরহাট, চন্ডিপুর, বেলকায় অপারেশন চালিয়ে প্রায় ৩০০ রাজাকার আলবদরকে পরাস্ত করে তাদের কাছে থাকা ৩০০ শতাধিক বিভিন্ন অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়। এরপর ৯ই ডিসেম্বর পাক বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধে অংশ নিয়ে পাক বাহিনী এবং তাদের দোসরদের পরাস্ত করে রাত ২টার দিকে সুন্দরগঞ্জ হেডকোটারকে সম্পূর্ণ শত্রু মুক্ত করে। পরে ১০ই ডিসেম্বর ভোরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা চত্বরে স্বাধীনতার রক্তিম বিজয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সুন্দরগঞ্জকে হানাদার মুক্ত ঘোষণা করা হয়। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড এমদাদুল হক বাবলু জানান, সুন্দরগঞ্জ থানাকে পাকবাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করতে যুদ্ধে অংশ নেয়া অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছে। এছাড়া অনেকে পঙ্গু হয়ে বেঁচে থেকে অতিকষ্টে দিন পার করছেন। শহীদদের স্মরণে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার গোয়ালের ঘাটে গড়ে তোলা হয় বধ্যভূমি। কিন্তু বধ্যভূমির জায়গাটি শুধু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিনেও গোয়ালের ঘাট বধ্যভূমিটি সংস্কার, সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তিনি আরও বলেন, গোয়ালের ঘাট বধ্যভূমিটি সংস্কার, সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে দাবিতে বিভিন্ন দফতরে আবেদন করা হয়। কিন্তু তাতে কোনো সাড়া মেলেনি। বর্তমানে গোয়ালের ঘাট জরুরিভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করা না হলে যে কোনো সময় পুরো বধ্যভূমিটি তিস্তা নদীগর্ভে বিলীন হবে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. হাবিবুল আলম জানান, গোয়ালের ঘাট বধ্যভূমির জায়গা সংরক্ষণ এবং তিস্তার নদীর ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার জন্য ইতিমধ্যে মাটি ভরাটের কাজ করা হয়েছে। এছাড়া বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা আছে। বরাদ্দ পেলেই বধ্যভূমির সংস্কার, সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। জিল্লুর রহমান পলাশ/আরএআর/এমএস