দেশজুড়ে

চিঠি চালাচালিতেই সীমাবদ্ধ শহীদ ডা. সালেহ উদ্দিনের স্বীকৃতি

স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি হবিগঞ্জের প্রথম শহীদ ডা. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং বিএমএ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শহীদদের তালিকায় ছবিসহ তার নাম রয়েছে। অথচ নিজ জেলার শহীদ বেদিতেই তার নাম নেই। মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও তার নাম অন্তর্ভূক্ত হয়নি। ২০১১ সালে তার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় শহীদ বেদিতে অন্তর্ভূক্ত করার দাবি জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন করেন চেতনায়-৭১ এর সদস্য সচিব সংসদ সদস্য অ্যাড. আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী। ইতোমধ্যে ৫ বছর অতিবাহিত হতে চললেও এখনও বিষয়টি চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।চেতনা ৭১ এর সদস্য সচিব সংসদ সদস্য অ্যাড. আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী জানান, তার নাম তালিকায় না আসার কারণে আমি ২০০৯ সালে একটি আবেদন করেছিলাম। পরে জামুকার সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্তও হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার বিষয়ে একটি রিট হওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, আমি আবেদনকারী হিসেবে প্রত্যাশা করি এ জটিলতা থেকে দ্রুত মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে।শহীদ ডা. সালেহ উদ্দিনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি সদর উপজেলার নিজামপুর গ্রামের বাসিন্দা আলহাজ্ব মাওলানা রফিক উদ্দিন আহমদের ছেলে। পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে নিজ শহর হবিগঞ্জে এসে আহমদ ক্লিনিক নামে একটি চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। মুক্তিযুদ্ধকালে তৎকালীন মহকুমা শহর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেন তিনি। একইসঙ্গে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বও নেন। সেখান থেকে নিরাপদে সীমান্ত অতিক্রমের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের পাস প্রদান করতেন। এপ্রিলের শুরুতে পাক বাহিনী হবিগঞ্জে প্রবেশ করেই গণহত্যার পরিকল্পনা চালায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী নেতাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। রাজাকারদের দৌরাত্ব তখন বেড়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তের ওপরে অবস্থানরত শরণার্থীদের জন্য কিছু টাকা সংগ্রহ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। উক্ত টাকা নিয়ে ২৯ এপ্রিল সীমান্তে শরণার্থী শিবিরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন ডা. সালেহ। হবিগঞ্জ থেকে ৭ মাইল দূরে শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছামাত্র পাকসেনাদের হাতে আটক হন তিনি। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগ কর্মী হীরেন্দ্র কুমার রায়। আটকের পর তাদেরকে নেয়া হয় শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুলে পাকসেনাদের ক্যাম্পে। সেখান থেকে লস্করপুরে রমজান মিয়ার বাড়ির সামনে নিয়ে মুখে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে গুলি করে তাদের হত্যা করে পাকবাহিনী। পরে তাদেরকে সেখানেই মাটিচাপা দেয়া হয়। তারাই ছিলেন হবিগঞ্জের প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর সালেহ উদ্দিনের মরদেহ উত্তোলন করে নিজ গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে নিয়ে দাফন করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪৫ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও পর্যন্ত এ বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাননি।শহীদ বীর ডা. সালেহ উদ্দিন আহমদের ভাই শাহাব উদ্দিন আহমদ বলেন, যখন আমার ভাইয়ের চিকিৎসা পেশা তুঙ্গে ঠিক তখনই মহান মুক্তিযুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করে। দেশের ক্রান্তিলগ্নে আমার ভাই শহর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। যুদ্ধ শুরুর পূর্বে তার প্রতিষ্ঠিত আহমদ ক্লিনিক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিদর্শনও করেন। যুদ্ধকালে আমার ভাই দায়িত্ব নেন কন্ট্রোল রুমের। শুরুর দিকেই পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন। জেলার প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্বেও তিনি এখনও পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদের স্বীকৃতি পাননি। অথচ তার নামসহ ছবি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও বিএমএ ভবনে শহীদ ডাক্তারদের তালিকায় রয়েছে। কিন্তু নিজ জেলায় তার নাম নেই। এমনকি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও তার নাম অন্তর্ভূক্ত হয়নি। এটি বড়ই দুঃখজনক। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে প্রকাশিত মুক্তি বার্তায়ও জেলার প্রথম শহীদ হিসেবে তার নাম রয়েছে। এমনকি শহীদ ডা. সালেহ উদ্দিনকে হত্যার দায়েই রাজাকার সৈয়দ কায়সারের ফাঁসির আদেশ হয় বলেও জানান তিনি।এফএ/এমএস