দেশজুড়ে

দক্ষিণাঞ্চলে লবণের সঙ্কট, দাম বৃদ্ধি

ঝালকাঠি বিসিক জোনের বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার ১৫টি মিলে অপরিশোধিত লবণ না থাকায় তিন মাস ধরে লবণ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে লবণের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। দাম বৃদ্ধি পেয়েছে লবণের। শত শত শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি দেশি লবণ  উৎপাদন কম হওয়ায় সরকার বিদেশ থেকে বোল্ডার লবণ আমদানির অনুমতি দেয়। এতে ঝালকাঠি জোনের ১৫টির মধ্যে ছয়টি মিল বিদেশ থেকে বোল্ডার লবণ আমদানির অনুমতি পায়। দুইটি মিল মালিক ইতিমধ্যেই আমদানিকৃত বোল্ডার আনলেও অপর চারটি মিলের মালিক বোল্ডার না আনায় লবণের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ঝালকাঠি বিসিকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বোল্ডার লবণ ঝালকাঠিতে না এনে আমদানির পারমিট কালোবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। তাই এসব মিল মালিকরা চট্টগ্রাম থেকে লাইটার জাহাজ সঙ্কটের অজুহাত দেখিয়ে এখন পর্যন্ত লবণ আনেনি। ঝালকাঠিকে বাণিজ্যের দিক দিয়ে এক সময় দ্বিতীয় কলকাতা বলা হতো। এখানে বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম হলো লবণ । ঝালকাঠি জোনে বর্তমানে ১৮টি লবণের মিল রয়েছে। লবণ শিল্পের সাথে এক হাজার ৮০০ শ্রমিক জড়িত। দেশীয় লবণের অভাবে ১৫টি মিলেই পরিশোধিত লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। একারণে লবণের মূল্য বেড়েই চলছে। আগে ঝালকাঠিতে ১ বস্তা লবণ বিক্রি হতো ৪০০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৩০০ টাকায়। এতে শ্রমিকরা পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশীয় লবণ সংকটের কথা চিন্তা করে দেশে ২৭০টি সল্ট আয়োডাইজস প্লান্ট (এসআইপি ) মিলের মালিকদের গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত বোল্ডার লবণ আমদানির গণ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে ঝালকাঠি জোনের ১৮টি মিলের মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে গাজী সল্ট মিল, শরীফ সল্ট মিল, আজাদ সল্ট মিল, ক্রিসেন্ট সল্ট মিল, পল্লী সল্ট মিল ও লাকী সল্ট মিলের মালিক লবণ আমদানির অনুমতি পায়। আবার অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় পর্যায় ৪ লবণ মিল মালিককে বোল্ডার লবণ আমদানির অনুমতি দেয়া হয়। এই মিল গুলো প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় ছয় হাজার মেট্রিক টন বোল্ডার লবণ আমদানির অনুমতি পায়। ঝালকাঠির গাজী সল্ট ও শরীফ সল্ট মিল মালিক তাদের ক্রয়কৃত অপরিশোধিত বোল্ডার লবণ ঝালকাঠি আনলেও  বাকি ৪টি মিল মালিক বিদেশ থেকে বোল্ডার লবণ আমদানির পারমিট চট্টগ্রামেই বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা।এ বিষয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হুমায়ুন কবির খান জানান,  ঝালকাঠিতে ১২টি লবণের মিল। লবণের অভাবে ১২টি মিলই বন্ধ। ঝালকাঠির দুই হাজার শ্রমিক লবণের কাজ করে। আজকে লবণের মিল যারা কাজ করেন তারা না খেয়ে অনাহারে আছে। শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুছ জানান, লবণের মিলগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। শ্রমিকরা বেকার ঘুরছে। লবণের দাম ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১০ টাকা কেজি দরের লবণ এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা।  গত ১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এমএম সল্ট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ লিডার হিসেবে ৪ হাজার ৯৭৪.১৫ মেট্রিক টন ক্রুড/বোল্ডার লবণ বিদেশ থেকে আমদানি করে।এদিকে ঝালকাঠির বরাদ্দ পাওয়া মিল মালিকরা লাইটার জাহাজ সঙ্কটের মিথ্যা অজুহাতে বোল্ডার না এনে দায় এড়াচ্ছেন। চট্টগ্রাম থেকে গাজী সল্ট মিলে বোল্ডার লবণ নিয়ে আসা ল্ইাটার জাহাজের নাবিক হারুন জানায়, চট্টগ্রাম নদী বন্দরে লাইটার জাহাজের কোনো সঙ্কট নেই। তাই আমরা এই মিল মালিকের লবণ নিয়ে এসেছি। ঝালকাঠির উৎপাদিত পরিশোধিত লবণ ঝালকাঠি থেকে রাজশাহী, বগুরা, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, পটুয়াখালী, বরগুনা , ফরিদপুর  জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সরবরাহ করা হয়।  ঝালকাঠি লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সোহরাব হোসেন জানায়, বোল্ডার লবণ নিয়ে শ্রমিক নেতৃবৃন্দের অভিযোগ সঠিক নয়। কারণ এটা শ্রমিকদের দিকে চেয়ে সরকার অনুমোদন দেয় নাই। এটা দিয়েছে দেশে লবণের ঘাটতি পূরণের জন্য। এই ঘাটতি পূরণের জন্য বোল্ডার লবণ আমার মিলে এনে আমি চালাবো। তিনি আরও বলেন, লাইটার জাহাজের সঙ্কটের কারণে ঝালকাঠিতে লবণ আনতে পারছি না। কবে নাগাদ লাইটার জাহাজ পেয়ে বরাদ্দ লবণ ঝালকাঠিতে আনা যাবে তা বলা যাচ্ছে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আনার জন্য চেষ্টা করছি। দি ঝালকাঠি সল্ট মিলের মালিক মো. খোকন জানান,  ঝালকাঠিতে  ১২টি লবণের মিল আছে। এরমধ্যে ২/৩ মিল চালু আছে। বাকি মিলগুলো অপরিশোধিত  লবণের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ছয়টি ও অক্টোবর মাসে চারটি মিল লবণ আমদানি করার অনুমতি পায়। তারমধ্যে দুইটি মিলের লবণ আসছে। বাকি মিলগুলোর লবণ এখন পর্যন্ত ঝালকাঠিতে এসে পৌঁছায়নি। কবে নাগাদ আসবে তা জানি না। ঝালকাঠি বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক মো. জালিস মাহামুদ জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঝালকাঠি জেলার ছয়টি লবণের মিল মালিক এই বোল্ডার আমদানির অনুমতি পেয়েছে। ইতিমধ্যে দুইটি লবণ মিলের লবণ এসে পৌঁছেছে। বাকি চারটি মিল এখন পর্যন্ত লবণ আনতে পারেনি। তাদের লবণ আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। তিনি আরও বলেন, ঝালকাঠি লবণ মিল শ্রমিকরা যে অভিযোগ করেছে তা সত্য নয়। তারপরও আমরা নজর রাখছি লবণ আনা হচ্ছে কিনা। এ জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। আরএআর/আরআইপি