দেশজুড়ে

সিরাজগঞ্জে তাঁত শিল্পের ৪ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী হতাশ

সুতার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছে সিরাজগঞ্জের তাঁত মালিক ও কাপড় ব্যবসায়ীরা। সেই সঙ্গে বিপাকে পড়েছেন তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত মালিক ও শ্রমিকেরা। এ কারণে হাট বাজারগুলোতে তাঁতের তৈরি শাড়ি, লুঙ্গি, গামছার দামও পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন খরচের চেয়ে কাপড়ের দাম কম হওয়ায় তাঁত মালিকরা কাপড় তৈরি বন্ধ করে দিচ্ছেন। এতে করে বেকার হয়ে পড়ছে শত শত শ্রমিক। এতে শ্রমিকরা পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে জীবনযাপন করছেন। এসব কারণে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত জেলার প্রায় ৪ লাখ শ্রমিক কর্মচারী এখন হতাশার মধ্যে পড়েছেন।সরেজমিনে জেলার তাঁত মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৬ মাস আগেও যশোরের নর্থ সাউথ স্পিনিং মিলস লি: এর ৫০ কউন্টের ফুলদানী মার্কা এক বস্তা সুতার দাম ১২ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। বর্তমানে এই সুতা তাঁতীদের কিনতে হচ্ছে ১৫ হাজার থেকে সাড়ে ১৫ হাজার টাকায়। আর এর প্রভাব পড়েছে কাপড়ের বাজারে। সুতার দাম বাড়লেও সেই অনুযায়ী দাম বাড়েনি শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছার দাম।সিরাজগঞ্জ তাঁত বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে শীতের পোশাকের কারণে হাট বাজারগুলোতে তাঁতের তৈরি কাপড়, লুঙ্গি ও গামছার বেচাকেনা কম হয়। কিন্তু সরকারিভাবে তাঁতীদের স্বাবলম্বী করতে ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৫৩৬ জন তাঁত মালিককে ৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। ঋণ নেয়ার পর থেকে তাদের ২ মাস কিস্তি দিতে হয় না। ঋণের টাকা নিয়ে কাপড় উৎপাদন করে তা বাজারে বিক্রি করে লাভের অংশ থেকে ঋণের টাকা পরিশোধ করেন তাঁতীরা।তাঁত বোর্ড সূত্র আরো জানায়, সিরাজগঞ্জ জেলায় এক লাখ ২৫ হাজার তাঁত রয়েছে। আর এই তাঁতের সঙ্গে প্রায় ২০ হাজার পরিবার জড়িত। সুতায় রং দেয়া, শুকানো, সুতা তৈরি করা ও কাপড় উৎপাদনের জন্য প্রতি তাঁতের জন্য তিন থেকে ৪ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। এতে মালিক শ্রমিক কর্মচারী মিলে প্রায় ৪ লাখ শ্রমিক এই তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত।  সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, সদর, কামারখন্দ, বেলকুচি, রায়গঞ্জ, চৌহালী, কাজিপুরে তাঁত কারখানা রয়েছে। এখানকার উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা দেশের বিভিন্ন হাট বাজারে বিক্রি হয়। বিশেষ করে উল্লাপাড়া, বেলকুচি, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, পাঁচলিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন বিশাল কাপড়ের হাট বসে। এসব হাটে লাখ লাখ টাকার কাপড় বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আসেন এসব হাটে। এমন কী সিরাজগঞ্জের উৎপাদিত কাপড় বিদেশেও রফতানি করা হচ্ছে।তাঁত মালিকরা জানান, শীতের পোশাকের চাহিদা থাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুতার দাম বৃদ্ধি করে। এজন্য তাঁতীদের লোকসানে পড়তে হয়। সিরাজগঞ্জের তৈরি শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছার চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এতে ব্যাপক বৈদেশিক মুদ্রা আয় হওয়ার পাশাপাশি শত শত নারী ও পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে সুতার দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁত কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার কারণে অনেক ব্যবসায়ীকে বিপাকে পড়তে হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী কারখানা তৈরি করে রাখলেও বিদ্যুতের কারণে উৎপাদনে যেতে পারছে না।কামারখন্দ উপজেলার চরদোগাছী গ্রামের আমজাদ হোসেন বলেন, গত এক মাস আগে সুতার যে দাম ছিল এতে আমার লোকসানও হতো না আবার লাভও হতো না। তিন্তু গত এক মাস হলো সুতার দাম বেড়েছে। বস্তা প্রতি ২ হাজার থেকে ২ হাজার দুই শত টাকা বেড়েছে। এ কারণে প্রতি মাসে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে আমার।সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাপড় ব্যবসায়ী আলহাজ সরকার বলেন, শীত আসলে সুতার দাম বাড়ে আর কাপড়ের দাম কমে যায়। এ কারণে শ্রমিকদের ঠিক মতো বেতন দিতে পারছি না। তিনি আরো বলেন, প্রতি থান গামছা তৈরির জন্য প্রতি জনকে ৭০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়। শীতের কারণে সুতার দাম বাড়ায় আমাদের ব্যবসা ভালো না। চরম লোকসান হচ্ছে। সুতার দাম কমানোর জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই।বেলকুচি উপজেলার তাঁত মালিক মজনু মিয়া বলেন, প্রতিমাসে আমার সুতা লাগে ৫ থেকে ৬ বস্তা। এতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। বাজারে কাপড়ের যে দাম তাতে লোকসান হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তাঁত কারখানা বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।সিরাজগঞ্জ তাঁত বোর্ডের সুপারভাইজার রাধা শ্যাম রায় বলেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে তাঁতের তৈরি কাপড় বিক্রি কম হয়। এর কারণ হলো শীতের এই সময়ে গরম কাপড়ের চাহিদা থাকে।এমএএস/আরআইপি