‘আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও। বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি, একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি। একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে, তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।’
কবি জসীমউদ্দিনের আসমানী কবিতায় রহিমদ্দির বাড়ির দৃশ্যের সঙ্গে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন ইউনিয়নের মুশুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেকটা মিল।
ভবন ও শ্রেণিকক্ষ স্বল্পতায় স্থানীয়রা স্কুলের মাঝেই ছোট্ট একটু ছাউনি দিয়ে তৈরি করেছেন একচালা শ্রেণি কক্ষ। শ্রেণি কক্ষটি এখন আসমানী কবিতার রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ির এক প্রতিচ্ছবি। এ কক্ষটিতে রোদ আর বৃষ্টি নিয়েই চলছে তৃতীয় শ্রেণির কোমলমতি শিশুদের পাঠদান। বিদ্যালয়টির শ্রেণি কক্ষ ও ভবন স্বল্পতা দেখে মনে হয় এটি দেখার কেউ নেই।
বিদ্যালয়টির তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রবিন, সাদিয়া, অ্যানি, ইয়ামনি ও সৌরভ বলে, আমরা থ্রিতে পড়ছি। আর কয়টা দিন। ফোরে উঠলেই বিল্ডিংয়ে পড়তে পারবো।
সরেজমিনে দেখা যায়, তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে সাতটি শ্রেণি কক্ষের প্রয়োজন থাকলেও রয়েছে মাত্র চারটি। গত তিন বছর আগে একটি পরিত্যাক্ত ভবন ভেঙে ওয়াশব্লক তৈরির পর থেকে সৃষ্টি হয় শ্রেণিকক্ষ স্বল্পতা।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, প্রাক-প্রাথমিকের জন্য বিদ্যালয়ের একটি কক্ষের মেঝে ব্যবহার করায় এই কক্ষে দ্বিতীয় শিফটের কোনো পাঠদান করা যায় না। বিদ্যালয়টির ছয়-সাত ফিটের একটি সিঁড়িও ব্যবহার করা হচ্ছে পাঠদানের কক্ষ হিসেবে। এতেও সংকুলান না হওয়ায় কিছুদিন খোলা আকাশের নিচে চলে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে স্থানীয়রা বিদ্যালয়ের মাঠের এক কোণে তৈরি করে এই কক্ষটি। যদিও কক্ষটি সম্পূর্ণই পাঠদানের অনুপযোগী। কক্ষ থেকে বাইরের পরিবেশ সহজেই দেখা যাওয়ায় শ্রেণিকক্ষে মনযোগী থাকছে না শিক্ষার্থীরা। এতে চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম। খোলা আকাশের নিচে পাঠদান বন্ধ হলেও নাম মাত্র কক্ষে চলছে তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান।
বিদ্যালয়টিতে নয়জন শিক্ষক-শিক্ষিকার পদ থাকলেও প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ায় একজন সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধান শিক্ষকের শূন্যতা আর শ্রেণিকক্ষ স্বল্পতায় নিয়ে ধুকেধুকে চলছে বিদ্যালয়টির পাঠদান কার্যক্রম।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির দেলদুয়ার উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম খান বলেন, শ্রেণিকক্ষ বাড়ানোর জন্য বিদ্যালয়ে একটি ভবনের বিশেষ প্রয়োজন। উপজেলা শিক্ষা অফিসকে বিষয়টি জানানোও হয়েছে। কিন্তু নতুন ভবনের আশ্বাস না পাওয়ায় এভাবেই চলছে পাঠদান কার্যক্রম।
এ প্রসঙ্গে দেলদুয়ার উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলাম বলেন, মুশুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন স্বল্পতা সম্পর্কে আমরা অবগত। এ বিদ্যালয়সহ উপজেলার পাঁচটি বিদ্যালয়ে ভবন স্বল্পতা রয়েছে। পাঠদানের বিঘ্ন ঘটায় আমরা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ভবন চেয়ে আবেদন করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভবন মেলেনি। তবে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে তিনি জানান।
আরএআর/পিআর