মঙ্গলবার দুপুর ২টা, রাজধানীর দারুস সালাম এলাকার রেডিও কলোনিতে তখনো সূর্যের তাপ বিরাজমান। চায়ের দোকানে খেটে খাওয়া মানুষের চাপও আছে। কাজের ফাঁকে খানিকটা জিরিয়ে নেওয়ার সময়ে খোশগল্প জমেছে বেশ। আলোচনা নির্বাচন কেন্দ্রিক; কারা যাবে সরকার, কেমন হবে নতুন সরকার? মানুষের এই লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণে যোগ দিয়েছেন খোদ চা দোকানিও। চায়ের দোকানে রাজনৈতিক আলাপ শুনে অংশ নেয় এই প্রতিবেদকও। এদিকে প্রচারণা কেমন হচ্ছে? প্রশ্ন ছুড়ে দিতেই লুফে নিয়ে আলোচনায় যোগ দেন একাধিকজন। মানুষের আলাপে উঠে আসে- নির্বাচন জমেনি। তারা বলেন, ‘আগের মতো পোস্টার ফেস্টুন, মিছিল শোডাউন- এগুলো তেমন দেখি না। তবে, মাজার রোড, নদীর ওপার ও মিরপুর-১ এবং মিরপুর-২ এলাকায় প্রার্থীরা ঘোরেন। ওদিকে ভোট বেশি।’ প্রার্থীদের অবস্থান মূল্যায়ন করতে গিয়ে রেডিও কলোনির বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ‘এখানে জামায়াতের প্লাস পয়েন্ট হলো, তাগো প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত, হাসপাতালসহ অনেক ব্যবসায় জড়িত। ছাড় দিলেই তো মানুষ খুশি। বিএনপির ভোট ভাগ হয়ে যাবে। স্বতন্ত্র প্রার্থী স্থানীয় ও বিএনপির বড় নেতা। আর ধানের শীষের প্রার্থী স্থানীয় না। তার বাসা শাহীন বাগ। স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতাই বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে।
এই আসনে মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন বলে মত ভোটারদেরকে জিতলে ভালো হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে একজন বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থীকে তো চিনিই না। বিদ্রোহী প্রার্থী তো তাফালিং করবে। তার লোক সব তো...। সব তো দেখা হইছে। এখন জামায়াত কেমন হবে, কে জানে!’ পাশের জন বলে ওঠেন, ‘স্বতন্ত্র থিকা সাজু টাকা দিয়ে কিছু ভোট নিবো। তুলি ধানের শীষ প্রতীকের কারণে কিছু ভোট পাইবো। মাঝখান দিয়ে জামায়াত জিতা যাইবো। এবার জামায়াতের অবস্থা ভালো।’
আরও পড়ুনচা-কফির চুমুকে নির্বাচনি আলাপ, জমজমাট ব্যবসা নির্বাচনের উত্তাপ নেই গ্রামে, গণভোটে কী হবে জানে না অধিকাংশ মানুষদলবাজির মধ্যে ধর্মকে আনা যাবে না: সানজিদা তুলি তার কথা টান দিয়ে আরেকজন বলে উঠলেন, ‘এবার শুধু বিএনপির ভোট ভাগ হবে না। জামায়াতের ভোটও ভাগ হবে। হাতপাখায় কিছু ভোট নিয়া যাইবো। তারা এক হলে আরও কিছু ভোট বাড়তো।’ নাম না বলে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের এক গাড়িচালক বলেন, ‘জামায়াত যেভাবে কাজ করতেছে, বিএনপি তো পারতেছে না। ওরা এবার অনেক দিকে আগায়া। ওরা চাকরি দেওয়ার কথা বলে, তাদের শত শত প্রতিষ্ঠান। চাইলে চাকরি দিতে পারবে। বিএনপি ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে। পরিবারপ্রতি আড়াই হাজার টাকা দিবো। এত টাকা কই পাইবো? দেশে তো গ্যাস নাই, কিনতে পারতেছে না। ফাও দেওয়ার টাকা কই?’
জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে ধানের শীষের সানজিদা ইসলাম তুলির মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে ঝাড়ুদার রমজান আলী বলেন, ‘আমি আগে ভোট দিতাম নৌকায়। যেদিন থেকে চরমোনাই গেছি, হাতপাখায় ভোট দেই। এবারও হাত পাখায় দেবো। তবে, এইখানে যা দেখতাছি দাঁড়িপাল্লা যাইবো (বিজয়ী হবে)। তবে, যদি আগে থেকে সরকারিভাবে নিয়ে যায় অন্য কেউ, তাহলে তো কিছু করার নাই।’ দারুসসালাম কবরস্থান গলিরমুখেও চায়ের আলাপে এমন চিত্রই ফুটে ওঠে। মানুষের মধ্যে আগের মতো নির্বাচনি আমেজ না থাকলেও তারা চান পরিবর্তন। তারা মনে করছেন ঢাকা-১৪ আসনে পরিবর্তন হবে। কাউন্দিয়া, বনগাঁও এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ডজনখানেক প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির সানজিদা ইসলাম তুলি, জামায়াতের মীর আহমাদ বিন কাসেম, স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) প্রয়াত এমপি এসএ খালেকের ছেলে ও দারুস সালাম থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু), জাতীয় পার্টির হেলাল উদ্দিন, এলডিপির সোহেল রানা, এবি পার্টির মনিরুজ্জামান, জেএসডির নুরুল আমিন, কমিউনিস্ট পার্টির রিয়াজ উদ্দিন, গণফোরামের জসিম উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলনের আবু ইউসুফ, রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন ও সুপ্রিম পার্টির ওসমান আলী।
এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দারুসসালাম থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক সাজু
এর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির সানজিদা ইসলাম তুলি, জামায়াতের মীর আহমাদ বিন কাসেম ও স্বতন্ত্র সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিকের (সাজু) মধ্যে।
এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) পশ্চিম আগারগাঁও, কল্যাণপুর, শহীদ মিনার রোড, দারুস সালাম, রেডিও কলোনি এলাকা ঘুরে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও দারুসসালাম থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক সাজুর ব্যানার-ফেস্টুন বেশি চোখে পড়ে। তবে ধানের শীষের প্রার্থী সানজিদা তুলি, দাঁড়িপাল্লার ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাসেম (আরমান) ও ইসলামি আন্দোলনের আবু ইউছুফের ব্যানার ফেস্টুনও আছে। দুপুর ২টায় কল্যাণপুরে একটি রিকশাযোগে মাইকিং করতে দেখা গেছে। সেখানে জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়ে গান বাজানো হচ্ছে। কিছুদূর এগুতেই দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ৪০০ থেকে ৫০০ লোকের মিছিলের দেখা মেলে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এদিন মাজার রোড এলাকায় দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) গণসংযোগ করেছেন। ধানের শীষ প্রতীকে নিয়ে সানজিদা ইসলাম তুলি টোলারবাগ, পাইকপাড়া এলাকায় প্রচারণা চালিয়েছেন। এসইউজে/ইএ