একাত্তরে নোয়াখালীতে সবচেয়ে বড় গণহত্যা সংঘটিত হয় বেগমগঞ্জের গোপালপুর বাজারে। ১৯ আগস্ট সকালে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় ৫৪ জন নিরীহ মানুষকে খালপাড়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।
হত্যাযজ্ঞ শেষে পাক আর্মি ও রাজাকাররা চলে যাওয়ার পর নিহতের স্বজনরা মরদেহ নিয়ে যায়। যার মধ্যে ২৪ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে।
তাদের নামে স্বাধীনতার ১৭ বছর পর গোপালপুর বাজারে স্থাপিত হয় স্মৃতিস্তম্ভ। স্থানীয় জনতা ক্লাবের উদ্যোগে এবং পরবর্তীতে জেলা পরিষদের অর্থায়নে স্মৃতিস্তম্ভটি সেই রোমহর্ষক গণহত্যার একমাত্র নিদর্শন।
চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর সড়কের বাংলাবাজার থেকে উত্তরে বেগমগঞ্জের উপজেলার গোপালপুর বাজার। যুদ্ধকালীন সময়ে এই বাজার ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম রিক্রুটিং ও ট্রেনিং সেন্টার।
সুবেদার লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে সেখানে চলতো মুক্তিসেনাদের প্রশিক্ষণ। তখনকার ছাত্রনেতা মোস্তাফিজুর রহমান (পরবর্তীতে এমপি), হায়াত খান, ডা. আনিসুল ইসলাম, আব্দুল বাতেন, ইউপি সদস্য নজীর আহম্মেদ মেম্বার, হাবিলদার জোবেদ আলী, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রহিম, অ্যাডভোকেট ফজল কবির, নৌবাহিনীর আব্দুল খালেক, আব্দুল নোমান, নুরুল আমিন চৌধুরী, মোস্তফা মহসিন দুলাল, মাহমুদুল হাসান চৌধুরী, জাকির হোসেন, আবু কায়েস মাহমুদসহ অনেকে তখন এই ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষক ছিলেন।
বেগমগঞ্জ কারিগরি উচ্চবিদ্যালয়ে স্থাপিত পাকিস্তানি সেনাক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের এই ঘাঁটিতে আক্রমণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে পাকআর্মিরা।
গোপালপুর আক্রমণের লক্ষে স্থানীয় দালালদের নিয়োগ করে পাকআর্মিরা। এদিকে প্রতিদিনই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শোনা যেতো পাকিস্তানিরা আসছে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় থাকতেন।
১৯ আগস্ট ভোরে পাকিস্তানি আর্মিদের বিশাল বহর অবস্থান নেয় বাংলাবাজারের সামছুন্নাহার উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে দুভাগে বিভক্ত হয়ে সকাল সাড়ে ৭টা ও পৌনে ৮টার দিকে গোপালপুর বাজারে প্রবেশ করে পাকআর্মি।
বাজারের পূর্বপাশ দিয়ে একটি দল এবং পশ্চিম পাশ দিয়ে আরেকটি দল প্রবেশ করে। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসেন স্থানীয় রাজাকার নেছার, আব্দুল মতিন, বাতেন, আবু বকর ছিদ্দিক, ইসমাইল, মফিজ উল্যা। এ সময় গোটা বাজার ঘিরে ফেলে তারা।
বাইরে অপারেশনে যাওয়ার কারণে গোপালপুর বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ডা. আনিছসহ কয়েকজন ছিলেন। তারপরও মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল।
পাকআর্মি বাজারে আক্রমণ করতে আসার খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে সহায়তাকারী মুসলিম লীগ নেতা মাহবুবুল হক চৌধুরী (নসা মিয়া) ভোরে বাজারে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের সরে যেতে বলেন।
পাশাপাশি বাজারের ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষকে দ্রুত বাজারত্যাগ করতে বলেন। ডা. আনিছসহ মুক্তিযোদ্ধরা বাজার থেকে সরে যাওয়ায় পাকিস্তানিরা পৌঁছে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে পায়নি। এতে ক্ষিপ্ত হয় পাকিস্তানি আর্মিরা। তখনো বাজারে দুই আড়াইশ সাধারণ মানুষ অবস্থান করছে।
সকাল ৮টার দিকে মুসলিম লীগ নেতা নসা মিয়া পাকিস্তান আর্মিকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এখানে মুক্তিযোদ্ধারা থাকেন না এবং এখানে কোনো ট্রেনিং সেন্টার নেই।
তার ধারণা ছিল, তিনি যেহেতু মুসলিম লীগ করেন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তার পরিচয় আছে সেহেতু তার কথায় হয়তো পাকসেনারা মানুষের ওপর অত্যাচার, হত্যা কিংবা বাড়ি ঘরে আগুন দেবে না।
কিন্তু রাজাকারদের ইন্ধন এবং প্ররোচণার কারণে নসা মিয়ার কথা কানেই নেয়নি পাকআর্মিরা। পাকিস্তানি সেনা এবং রাজাকারা শুরু করে তল্লাশি।
এ সময় নসা মিয়ার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পাশে একটি ঘর (কিছুক্ষণ আগে এখানে মুক্তিযোদ্ধারা ছিল) থেকে গুলির খোসা এবং মোহাম্মদ উল্যার দোকান থেকে একটি বাংলাদেশের পতাকা পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে পাকিস্তানি সেনারা।
এরই মধ্যে বিভিন্ন দোকান থেকে লোকজনকে ধরে এনে বর্তমানে ব্যাংকের পূর্বপাশের খালি জায়গায় জড়ো করতে থাকে। পাকআর্মিরা এ সময় ইউপি সদস্য দীন ইসলাম, ব্যবসায়ী ছিদ্দিক উল্যা, তার দোকানের কর্মচারী হাবিব উল্যা, মোহাম্মদ উল্যা দর্জিকে বাজারের মাঝখানেই বেধড়ক পিটুনি দেয়। মারধর থেকে বাদ যায়নি নসা মিয়াও।
সকাল ১০টা নাগাদ জড়ো করা প্রায় ২৫০ জন লোকের মধ্য থেকে নসা মিয়াসহ ৫৬ জনকে বাজারের পূর্বদিকের রাস্তায় খাল পাড়ে দাঁড় করায় এবং বাজারে আগুন ধরিয়ে দেয় পাকআর্মি ও রাজাকাররা।
নসা মিয়া তখন লাইনে দাঁড় করানো ৫৬ জনের মধ্য থেকে তাদের মসজিদের ইমাম হাফেজ আজিজুর রহমান এবং পোস্টম্যান আব্দুল মান্নানের জীবন ভিক্ষা চান পাক সেনাদের কাছে।
নসা মিয়ার অনুরোধ রক্ষা করে এই দুজনকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু নসা মিয়ার রক্ষা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার অপরাধে রাজাকারদের ইন্ধনে লাইনে নসা মিয়াসহ দাঁড় করানো বাকি ৫৪ জনকে খালের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াতে বলে পাকিস্তানিরা। পরে সবাইকে একসঙ্গে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়।
সৌভাগ্যক্রমে গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ই একজন বেঁচে যান। পাকসেনারা চলে যাওয়ার পর দুপুর ১২টার দিকে পর্যায়ক্রমে শহীদদের স্বজনেরা মরদেহ নিতে আসে।
শহীদদের তাজা রক্তে লাল হয়ে যায় বর্ষার খালের পানি। শহীদদের মরদেহ সমাহিত হয় স্ব স্ব শহীদের পারিবারিক কবরস্থানে। এ জন্য অনেকের নাম পরিচয় তখন শনাক্ত করা যায়নি।
লাইনে দাঁড়ানোর পরও নসা মিয়ার অনুরোধে সেদিন বেঁচে যাওয়া হাফেজ আজিজুর রহমানের ভাষ্যমতে, এমনিতেই প্রতিদিন শোনা যেতো পাকিস্তানিরা আসছে, আসছে।
১৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ৭টার দিকে যখন গোপালপুর বাজারের দুই পাশ দিয়ে পাকিস্তানিরা আসে তখন তাদের অগ্রভাগে ছিল রাজাকার। বাজারের পশ্চিম প্রান্তের প্রাইমারি স্কুলের মাঠ পেরিয়ে যখন বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম। তখন পদিপাড়ার রাজাকার নাজিম বলেন, ‘এই দাঁড়াও’। আমি দাঁড়াইনি, ইতোমধ্যে মানুষের জটলা বেঁধে গেলে আমি বলি, ‘সবাই ভাগো’।
মানুষজনকে চলে যেতে বলায় আমাকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে বাজারের মাঝখানে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে তুলে দেয়। পাকসেনারা মনে করে আমি মুক্তিফৌজের কমান্ডার। তারা আমাকে চেক করে, এমন সময় দেখি কাপড়ের দোকান থেকে একটা ছেলেকে বের করে এনে অমানবিক নির্যাতন করে।
বাজার থেকে রাজাকার আর পাকসেনারা ১৩০ জনকে বের করে বর্তমানে ব্যাংকের পূর্বপাশের খালি জায়গায় জড়ো করে। সেখান থেকে আমাদের নিয়ে যায় খাল পাড়ে।
এ সময় মাহবুবুল হক চৌধুরী (নসা মিয়া) এসে পাকসেনাদের অনুরোধ করে এখানে কোনো মুক্তিযোদ্ধা নেই, এরা সবাই বাজারে খুচরা ব্যবসা করে। এরা নিরীহ জনসাধারণ। এদের ছেড়ে দেন।
এমন সময় বর্তমানে ব্যাংকের পূর্বপাশের একটি কাপড় দোকান থেকে বাংলাদেশের পতাকা বের করে আনে কয়েকজন পাকসেনা। এতে কমান্ডার উত্তেজিত হয়ে নসা মিয়াকে মারধর করে এবং কাপড় দোকানদারের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়।
রাজাকার এবং পাকআর্মিরা বাজার তল্লাশি করে প্রায় ২৫০ জনকে জড়ো করে খালপাড়ের দিকে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ৫৬ জনকে বেছে লাইনে দাঁড় করায় খাল পাড়ে। নসা মিয়ার অনুরোধে আমাকে এবং পোস্টম্যান আব্দুল মান্নানকে ছেড়ে দেয় তারা।
আমি যখন হেঁটে বাজার পার হচ্ছিলাম তখন দেখতে পাই, লাইনে দাঁড়ানো ৫৪ জনকে একসঙ্গে ব্রাশ ফায়ার করা হলো। এটি দেখে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়ে যাই। পরিচিত একজন কসাই আমাকে তুলে বাড়ি যেতে সহায়তা করে। ১২টার দিকে এসে দেখি খাল ভর্তি হয়ে আছে মানুষের লাশ। ভরা বর্ষার খালের পানি রক্তে লাল হয়ে আছে। খালজুড়ে রক্তের বন্যা।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা বেলায়েত হোসেন রানু বলেন, এই নৃশংস হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা এখনো ঘুরে বেড়ায়। মানুষজন তাদের চিনে। এদের বিচার হওয়া উচিত। পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যায় এসব শহীদ পরিবারকে মুক্তিযোদ্ধাদের মতো রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা দেয়ার দাবিও জানান তিনি।
মিজানুর রহমান/এএম/আরআইপি