অবহেলা, অনাদর আর অর্থাভাবে চিকিৎসা না হওয়া সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পারমাদরা গ্রামের ৯ বছর বয়সী কিশোরী দেবশ্রী ৬৬ দিন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমই্উ) চিকিৎসা নেয়ার পর সম্প্রতি সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছে।
বিএসএমএমই্উ’র চিকিৎসকদের পর পর তিনটি সফল অপারেশনের মাধ্যমে দেবশ্রীর জিহ্বা, ঠোঁট ও গলা থেকে টিউমার অপসারণ করা হয়েছে। এতে করে দেবশ্রীর জিহ্বাটি এখন অন্যদের মতো স্বাভাবিক হয়েছে।
দীর্ঘ ৯ বছর জিহ্বায় বিশাল আকৃতির টিউমার নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করেছে দেবশ্রী। পারিবারিক অবহেলায় তার সুচিকিৎসা হয়নি। একবার ভারত নিয়ে গেলেও সেখান থেকে চিকিৎসকরা তাকে ফেরত পাঠিয়েছেন। ভারতে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, দেবশ্রীকে অপারেশন করলে সে মারা যাবে। এরপর থেকে তার চিকিৎসার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি পরিবার।
মানবিক এ ঘটনাটি দৃষ্টিতে আসার পর গত ১৫ জানুয়ারি ‘টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না দেবশ্রীর’ শিরোনামে জাগো নিউজে সংবাদ প্রকাশ হয়। সংবাদ প্রকাশের পর র্যাব হেড কোয়ার্টারের সিনিয়র সহকারী সচিব ম্যাজিস্ট্রেট আকবর হোসেন দেবশ্রীকে চিকিৎসার জন্য সহায়তা করবেন বলে জাগো নিউজকে জানান।
এরপর ১৬ জানুয়ারি দেবশ্রীকে সাতক্ষীরায় খুলনা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক মনোয়ার হোসেনকে দেখানো হয়। সব কিছু দেখে তিনি দেবশ্রীকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসার পরামর্শ দেন। ‘দেবশ্রীর চিকিৎসা শুরু’
দেবশ্রীর চিকিৎসার জন্য হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে জাগো নিউজের সহকারী বার্তা সম্পাদক মাহাবুর আলম সোহাগ ও সাতক্ষীরা প্রতিনিধি আকরামুল ইসলাম ফেসবুকে প্রচারণা শুরু করেন। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন হৃদয়বান মানুষ দেবশ্রীর চিকিৎসার জন্য সহায়তা দিতে শুরু করেন। সেই সঙ্গে তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফরিদ হোসেন ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ১০ হাজার টাকা সহায়তা করেন।
এরপর গত ২১ জানুয়ারি জাগো নিউজের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি আকরামুল ইসলাম দেবশ্রী, তার বাবা সমীরণ, চাচা সৌমিত্র ও দাদি কৌশল্লা রায়কে নিয়ে ঢাকায় আসেন। ২৩ জানুয়ারি দেবশ্রীকে ভর্তি করা হয় বিএসএমএমই্উতে। ‘চিকিৎসার জন্য দেবশ্রীকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে ভর্তি’
সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পর ১৫ ফেব্রুয়ারি দেবশ্রীর প্রথম সফল অস্ত্রোপচার করা হয় জিহ্বায়। ‘দেবশ্রীর অস্ত্রোপচার সফল’
পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত ৮ মার্চ দেবশ্রীর দ্বিতীয় ধাপে অপারেশন করা হয় ঠোঁট ও গলায়। এরপর পর্যবেক্ষণ শেষে ১৭ মার্চ সকালে চিকিৎসকরা দেবশ্রীকে ছাড়পত্র দেন। সেদিনই দেবশ্রীকে তার নিজ বাড়ি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পারমাদরা গ্রামে নেয়া হয়।
বাড়িতে ফেরার পর দেবশ্রীর বাবা সমীরণ রায় জাগো নিউজকে বলেন, ভারত থেকে ফিরিয়ে দেয়ার পর দেবশ্রীকে সুস্থ হওয়ার আশা আমরা ছেড়েই দিয়েছিলাম। অথচ তার চিকিৎসা বাংলাদেশেই হলো। ধন্যবাদ জাগো নিউজকে। তাদের কারণেই আমার দেবশ্রী এখন সুস্থ। এতে করে আমরা সবাই খুব খুশি।
তিনি জানান, আগামী তিন সপ্তাহ পর আবারও বিএসএমএমই্উতে যেতে বলেছেন।
বিএসএমএমই্ ‘র অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান তরফদার জাগো নিউজকে বলেন, দেবশ্রীকে সুস্থ করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। এত বড় জিহ্বা নিয়ে আগে কখনও কেউ আসেনি। তার সব অপারেশন সফল হয়েছে। পরবর্তীতে বাচ্চাটির ডান পাশের কানের ওপর টিউমারটির অপারেশন করা হবে। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে যাবে দেবশ্রী।
এদিকে দেবশ্রী বাড়িতে ফেরার পর তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফরিদ হোসেন জাগো নিউজকে ধন্যবাদ জানান।
র্যাব হেড কোয়ার্টারের সিনিয়র সহকারী সচিব আকবর হোসেন বলেন, দেবশ্রীকে সহযোগিতা করা ছিল আমাদের দায়িত্ব। সমাজের যারা অবহেলিত, সবার উচিত এসব অসহায় মানুষের পাশে এগিয়ে আসা।
এমএএস/এমএস