বগুড়ার গাবতলী মডেল থানা পুলিশের ওসি আ ন ম আবদুল্লাহ আল হাসানকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার বাধ্য করার অভিযোগে সাবেক স্ত্রী রুমানা আকতার মিতুর (২৫) বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
বুধবার রাতে তার স্ত্রী সুলতানা রাজিয়া রোজী বেগম গাবতলী মডেল থানায় এ মামলা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাবাতলী মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান।
তদন্তকারী কর্মকর্তা নুরুজ্জামান জানান, ওসি হাসানের আত্মহত্যার খবর পেয়ে স্ত্রী রোজী, দুই সন্তান ও তার আত্মীয়-স্বজনরা গাবতলীতে ছুটে আসেন। রাতেই রোজী তার স্বামীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনায় বাধ্য করার অভিযোগে সাবেক স্ত্রী মিতুর বিরুদ্ধে গাবতলী থানায় মামলা করেন। মামলায় মিতু ছাড়াও অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
বুধবার বিকেলে ৫টার দিকে রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইডি (প্রশাসন ও অর্থ) মাসুদুর রহমান ভুঁইয়া ঘটনাস্থলে আসেন। তারপর ওসি হাসানের মরদেহ বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল মর্গে নেওয়া হয়। পরে ময়নাতদন্ত শেষে ওসি হাসানের মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) সনাতন চক্রবর্তী জানান, বুধবার রাতে পুলিশ লাইন্স মাঠে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে ডিবি পুলিশ মিতুকে পাবনা থেকে গ্রেফতার করে বগুড়ায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও গোয়েন্দা পুলিশ পরিদর্শক আমিরুল ইসলাম তা অস্বীকার করে জানান, মিতুকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত তাকে পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে পাবনা সদর থানা পুলিশের ওসি আবদুর রাজ্জাক জানান, মিতুকে গ্রেফতারের ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই।
আত্মহত্যার আগে ওসি হাসানের দেওয়া চিঠি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলছেন। কর্মকর্তারা ওই চিঠিতে কী লেখা রয়েছে, তা নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। অন্যদিকে ওসি হাসানের পরিবারের সদস্যরাও কেউ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।তবে বর্তমান ও সাবেক স্ত্রীকে নিয়ে সৃষ্ট দাম্পত্য কলহের কারণেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে অনেকে দাবি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানান, ওসি হাসান দ্বিতীয় স্ত্রী মিতুকে তালাক দিলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তাকে পাবনায় ২০ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্লাটও কিনে দেন। তার সাবেক ও বর্তমান স্ত্রী বগুড়ায় আসতে চাইলে তিনি বিপাকে পড়েন। তিনি গত কয়েকদিন ধরে এ নিয়ে বিমর্ষ ছিলেন।
বুধবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে তিনি থানায় এসে কিছুক্ষণ ছিলেন। পরে ডিউটি অফিসার এএসআই হাসিনাকে একটি চিঠি ও চাবি দিয়ে বলেন, ‘তোমার ভাবী এলে দিও। আর আমি বদলি হলে আমায় ক্ষমা করে দিও।’ এরপর কোয়াটারে গিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। এএসআই হাসিনা এবং ওসির বডিগার্ড কনস্টেবল কাইয়ুম সরকারি কোয়াটারে গিয়ে তার ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান।
জানা গেছে, আ ন ম আবদুল্লাহ আল হাসান নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার কদমতলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা হযরত আলীর ছেলে। তিনি গত ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর পাবনা সদর থানায় ওসি হিসেবে যোগদান করেন। তার স্ত্রী সুলতানা রাজিয়া রোজী পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া ছেলেকে নিয়ে রাজশাহীর উপ-শহরে বসবাস করতেন।
ওসি হাসান পাবনা থাকাকালে শহরের শালগাড়িয়ার মোকসেদ আলীর মেয়ে রুমানা আকতার মিতুর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তাকে বিয়েও করেন। দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি জানাজানি হলে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হয়। গত বছরের ৪ নভেম্বর রোজী পাবনা থানা কোয়ার্টারে এসে ওসি হাসান ও মিতুকে প্রকাশ্যে সেন্ডেল দিয়ে পেটান। পরে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাটি চাপা দিতে ৫ নভেম্বর ওসি হাসানকে জয়পুরহাটে বদলি করেন।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বগুড়ার গাবতলী থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে যোগ দেন। গাবতলী থানার সরকারি কোয়াটারেও ওসি হাসান একাই থাকতেন।
লিমন বাসার/এমএএস/আরআইপি