ঠা ঠা বরেন্দ্র ভূমি অঞ্চল নওগাঁর পত্নীতলা, পোরশা ও সাপাহার উপজেলা। এসব উপজেলায় বেশির ভাগ জমি অনাবাদি। বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে আমন ধানের আবাদ করা হয়। পত্নীতলার দিবর ইউনিয়নে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) পাতকুয়া (সৌর প্যানেল সোলার পাম্প) স্থাপন করে ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্থাপনার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে।
এই ইউনিয়নের ভূ-প্রকৃতি গঠনের ভিন্নতার কারণে অ্যাকুইফার না থাকায় সাধারণত গভীর/অগভীর নলকূপ খনন করা সম্ভব হয় না। এ অঞ্চলের ফসল বৃষ্টি নির্ভর বললেই চলে। পাতকুয়ার মাধ্যমে পতিত জমিতে এখন সবজি চাষ শুরু হয়েছে। পতিত জমিতে সবজির আবাদ হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক সফলতা এসেছে।
জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে আমন ধানের আবাদের পর খরা মৌসুমের ৭/৮ মাস পানির অভাবে অনাবাদি পড়ে থাকে জেলার পত্নীতলা, পোরশা ও সাপাহার উপজেলার হাজার হাজার বিঘা জমি। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ জরিপ ও অনুসন্ধান পরিচালনা শেষে নলকূপের মাধ্যমে পাতকুয়া খননের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রিজিয়ন-২ সূত্র জানায়, ২০১৪-১৫তে সোলার প্যানেল পাতকুয়ার উপর ফানেল আকৃতিতে স্থাপন করা হয়েছে। যেন বৃষ্টির পানি হারভেস্ট করা যায়। পাতকুয়ার গভীরতা ৬০ ফুট ও ব্যাস ৪৬ ইঞ্চি।
স্থাপিত সোলার প্যানেলের ক্ষমতা ৯০০ ওয়াট এবং পাম্পের ক্ষমতা ৫০০ ওয়াট। পাম্পটির হেড ৩০ মিটার এবং পাম্পটির ডিসচার্জ এক লিটার/সেকেন্ড। পাতকুয়ার আশপাশের পতিত জমিতে শাক-সবজি আবাদের জন্য এক ইঞ্চি ডায়া ইউপিভিসি পাইপের মাধ্যমে এক হাজার ৮০০ ফুট ভূগর্ভস্থ পাইপ নালা নির্মাণ করা হয়।
সেচের জন্য ২১টি ট্যাপ স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি পাতকুয়া খনন করতে গভীরতা অনুয়ায়ী দেড় থেকে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। দুটি সোলার প্যাম্পের মাধ্যমে প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও অন্যান্য পাতকুয়ার মাধ্যমে আরও ৬০ থেকে ৭০ বিঘা জমিতে সবজি চাষ করা হচ্ছে।
৪১টি পাতকুয়া খননের মাধ্যমে পত্নীতলা ঠাঁ ঠাঁ বরেন্দ্র এলাকায় চার হাজার হতদরিদ্র গ্রামীণ জনসাধারণকে খাবার পানি সরবরাহ ও ২৮০ একর অনাবাদি জমিকে আবাদি জমিতে রুপান্তর করা হয়। সোলার পাম্পের মাধ্যমে পাতকুয়া থেকে অটোমেটিক পানি উঠানো হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় সেচের অভাবে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমি পতিত থাকে। এর মধ্যে পত্নীতলায় পাঁচ হাজার, পোরশায় ১০ হাজার, সাপাহারে পাঁচ হাজার হেক্টর জমি।
পাতকুয়ার পানি স্থানীয় বাসিন্দারা আসবাবপত্র ও বাড়ির অন্যান্য কাজে ব্যবহার করার পাশাপাশি পতিত জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ শুরু করেন। পানি কম লাগে এবং স্বল্প সময়ে আবাদ করা যায় এমন শাক-সবজির আবাদ করছেন কৃষকরা। পাতকুয়ার পানি দিয়ে অনাবাদি জমিতে আবাদ করায় অনেকে উপকৃত হচ্ছেন। সবজির আবাদ ভালো হওয়ায় পাতকুয়ার সুফল পেতে শুরু করেন এলাকাবাসী।
চকসহবত গ্রামের উপকারভোগী প্রভাষ চন্দ্র বলেন, পানি সমস্যায় এক সময় জমিগুলো অনাবাদি পড়ে থাকত। এখন পাতকুয়ার পানি দিয়ে দুই বিঘা জমিতে মাষকলাই, টমেটো ও বেগুনের আবাদ করেছেন।
মমতা রাণী বলেন, এক সময় এক দেড় কিলোমিটার দূরে গ্রামের ভেতর থেকে খাবারের পানি সংগ্রহ করতে হতো। পুকুরের নোংরা পানিতে গোসল করতে হতো। এখন পাতকুয়ার পানি খাওয়া, রান্না থেকে শুরু করে গোসল ও সাংসারিক সব কাজকর্ম করা হয়।
পত্নীতলা রিজিয়ন দিবর ইউনিয়ন মাঠকর্মী দিলীপ কুমার দাস বলেন, এই স্কিমের আওতায় ১৪জন কৃষকের জমি আছে ২০ বিঘা। সোলার প্যানেলের আওতায় সকল কৃষকদের সুষমভাবে পানি বণ্টন করা হয়। আর রাতে খাবার পানির জন্য দুটি বড় ট্যাংকিতে ব্যবস্থা আছে। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত পানি সরবরাহ করা হয়। আর বাকী সময় পাতকুয়া বন্ধ থাকায় এর আশপাশ থেকে পানি এসে আবার জমা হয়।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পত্নীতলা রিজিয়নের সহকারী প্রকৌশলী আল-মামুনুর রশীদ বলেন, এ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি ছিল। বর্তমান সরকারের কৃষি মন্ত্রীর ইনোভেশনে খনন করা ৪১টি পাতকুয়ার মধ্যে চারটি সোলার প্যানেল আছে। পাতকুয়া স্থাপনের ফলে স্থানীয়রা উপকৃত হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকার আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেচ বঞ্চিত এলাকাকে শাক-সবজির ভাণ্ডার হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, দিন দিন পানির স্তর নিচে নামায় গভীর থেকে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি যাতে কম ব্যবহৃত হয় এজন্য বরেন্দ্র অঞ্চলগুলোতে পাতকুয়া খনন করা হয়েছে।
আরএআর/পিআর