সিলেটের মৌলভীবাজারের বড়হাটে ‘অপরাশেন ম্যাক্সিমাসের’ সময় আত্মঘাতি বোমা বিস্ফোরণে নিহত জঙ্গি আশরাফুল ইসলাম নাজিমের বোনসহ আরো এক কলেজছাত্র গত কয়েকমাস ধরে নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। নিহত নাজিমের মায়ের দাবি তার মেয়েও ছেলের মত বিপথে চলে গেছে। তবে আরেক যুবকের বিষয়ে স্থানীয় থানা পুলিশ কিছুই জানে না বলে দাবি করেছে।
সিলেটের মৌলভীবাজারের বড়হাটে নিহত নব্য জেএমবি সদস্য আশরাফুল ইসলাম নাজিমের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার দেওটি ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড কুমারঘরিয়া গ্রামে। গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত হলেও অনেক মুসলমান পরিবারের বসবাস রয়েছে ওই গ্রামে। এরই মধ্যে মিয়াজন মসজিদ বাড়ির সুলতান মিয়া ও তার কয়েকভাই বিগত কয়েক বছর আগে পার্শ্ববর্তী হিন্দুদের কালিবাড়ী সংলগ্ন ভূমিতে বসবাস শুরু করেন। অবশ্য উক্ত সম্পত্তিতে তাদের বসবাস নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে মামলা চলছে।
সরেজমিনে কুমারঘরিয়া গ্রামে গিয়ে জানা যায়, সুলতান মিয়ার স্ত্রীসহ ২ ছেলে ও ৫ মেয়ে রয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। তার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সংসার করছেন। দুরাবস্থা দেখে ঢাকায় অবস্থানরত মোনোয়ারা বেগমের বাবা নাতি নাতনীদের তার কাছে নিয়ে রাখেন এবং বিভিন্ন মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে লেখাপড়া করান।
ভাই বোনদের মধ্যে সবার ছোট আশরাফুল ইসলাম নাজিম। সে পার্শ্ববর্তী চাটখিল উপজেলার কড়িহাটি ছালেমিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদরাসা থেকে দাখিল ও ২০১৪ সালে আলিম পাস করে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতাহের হোসেনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে বাড়িতে গিয়ে কথা হয় নাজিমের মা মনোয়ারা বেগমের সঙ্গে।
তিনি জানান, সিলেটে গিয়ে তিনি তার ছেলের মরদেহ শনাক্ত করেছেন। তবে যে ছেলে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করে সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করে তিনি সে ছেলের মরদেহ নিজ গ্রামে আনতে চাননি।
তিনি আরো জানান, বেশ কয়েকমাস আগে নাজিম বাড়ি এসেছিল। যাওয়ার সময় বলে গেছে মা আপনাকে না দেখলে মনটা সব সময় খারাপ থাকে। এ আদরের ছেলে এমন কাজ করবে তিনি কথনো ভাবতে পারেননি।
আলপাচারিতায় তিনি জানান, তার আরো এক মেয়ে নাজমা আক্তার কয়েকমাস ধরে নিখোঁজ রয়েছে। দেড় বছর আগে তাকে ফেনীর এক মাদরাসা শিক্ষকের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তার সংসার টেকেনি। স্বামী তাকে তালাক দেয়ার পর ঢাকায় নানার কাছে চলে যায়। সেখানে নুরানী মাদরাসায় পড়াতো। তার ধারণা ছেলের সঙ্গে মেয়েও বিপথে চলে গেছে। মেয়ে যদি খারাপ পথে যায় তাহলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গ্রামের বাড়িতে জঙ্গি নাজিমের নিয়মিত আসা যাওয়া ছিলো না। মাঝে মধ্যে আসত। ঘটনার পর এলাকায় পুলিশ দেখে তারা জানতে পারেন নাজিম জঙ্গি ছিল। তবে তার আচার আচরণে কেউই এটি আগে বুঝতে পারেনি। নাজিম যে মাদরাসা থেকে লেখাপড়া করেছেন সে মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সাইফুল্যাহ জানান, নাজিম মারা যাওয়ার পর তারা মাদরাসার কাগজ পত্র দেখে বুঝতে পারেন যে সে তাদের মাদরাসার ছাত্র ছিল। এ মাদরাসা থেকে দাখিল ও আলিম পাস করে ফাজিলে ভর্তির ফরম নিলেও ভর্তি হয়নি সে।
কুমারঘরিয়া ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোতাহের হোসেন জানান, জঙ্গি নাজিমের এক বোনসহ এলাকার আবদুল আল আনাচ নামে আরো এক কলেজফাত্র গত ৭ থেকে ৮ মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছে।
তার কথার সূত্র ধরে একই গ্রামের হাজী কোব্বাত আলী ছুয়ানি বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, ওমান প্রবাসী আবু হানিফ নয়নের ছেলে আবদুল্যাহ আল আনাচ ২০১৬ সালে চাটখিল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে।
তার মা আনোয়ারা বেগম জানান, ছেলে ওষুধ কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে গত কুরবানির ঈদের ৫ দিন পর বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। বাড়ি থেকে যাওয়ার ৫ দিন পরও ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে তিনি সোনাইমুড়ী থানায় যান সাধারণ ডায়েরি করতে। কিন্তু পুলিশ জিডি না করে তাকে ফিরিয়ে দেন। তার ছেলের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার থাকার কথা স্বীকার না করলেও তার ঘরে রাখা ডায়েরি দেখে বোঝা যায় সে ধর্মভীরু ছিল এবং সেখানে নিহত জঙ্গি নাজিমসহ আরো অনেকের মোবাইল নম্বর রয়েছে।
এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসামাইল মিয়া জাগো নিউজকে জানান, তারা নিহত জঙ্গি নাজিমের মায়ের সঙ্গে কথা বলে বঝুতে পেরেছেন যে তার আরো এক মেয়ে নিখোঁজ রয়েছেন। তবে একই গ্রামের আরো এক কলেজছাত্র দীর্ঘ দিন নিখোঁজ রয়েছে বলে তাদের জানা নেই।
মিজানুর রহমান/এফএ/পিআর