কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পুলিশের এক এসআইয়ের বিরুদ্ধে কলেজছাত্রকে থানায় নিয়ে গুলি করার হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে কুষ্টিয়া জুড়ে। মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভাতেও জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ এক নেতা বিষয়টি উত্থাপন করেছেন।
অবশ্য যার বিরুদ্ধে অভিযোগটি উঠেছে সেই দৌলতপুর থানার উপপরিদর্শক জাহিদ বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন, ছেলেটি ভদ্র, তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তিনি ওসিকে অনুরোধ করেছিলেন। তবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দাবি ছেলেটি মাদক ব্যবসায়ী।
ওই কলেজছাত্রের নাম আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তার বাবা ইসমাইল হোসেন উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং ওই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। টানা চার বার তিনি ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
বর্তমানে ঢাকায় অবস্থানরত মামুন মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে জানান, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাড়ির সামনে একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন তিনি। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দুটি মোটরসাইকেলে সেখানে যান। পুলিশ সদস্যরা তার নাম-পরিচয় জানতে চান। তিনি বলার পর তাকে হাতকড়া পরিয়ে দৌলতপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে তাকে হাজতে রাখা হয়।
রাত আড়াইটার দিকে থানার এসআই জাহিদ হাজতখানায় ঢুকে বলেন, ‘মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিন। ওপরের নির্দেশ আছে। আপনাকে গুলি করা হবে।’ এই বলে এসআই চলে যান।
রাত ৩টার দিকে পুনরায় হাজতখানায় ঢুকে এসআই জাহিদ তার নাম-পরিচয়-ঠিকানা লিখে নেন। তখন মামুন এসআই জাহিদকে বলেন, ‘আমাকে বুকে গুলি করে মেরে ফেলেন। পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দিয়েন না।’
মামুন বলেন, শুক্রবার বিকেলে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হয় তাকে। সেখানে তাকে এক হাজার টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেয়া হয়।
মামুনের বাবা ইউপি সদস্য ইসমাইল হোসেন জানান, ছেলেকে আটকের খবর পেয়ে চায়ের দোকানে ছুটে যান তিনি। পুলিশ সদস্যরা তাকে বলেন দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নির্দেশ আছে মামুনকে ধরে থানায় নিতে হবে।
কোনোভাবে সন্তানকে ছাড়াতে না পেরে ইসমাইল ছুটে যান স্থানীয় সাংসদ রেজাউল হক চৌধুরীর কাছে। তাকে দিয়ে সুপারিশ করিয়েও ছেলেকে ছাড়াতে পারেননি। স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তার ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ ইসমাইল হোসেনের।
জানতে চাওয়া হলে দৌলতপুরের ইউএনও তৌসিফুর রহমান বলেন, পুলিশ ওই যুবককে মাদক সেবনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করেছিল। পরে আদালত এক হাজার টাকা জরিমানা করেন।
গুলির হুমকির অভিযোগের বিষয়ে এসআই জাহিদ দাবি করেন, তিনি মামুনকে একবারই দেখেছেন থানা হাজতে। তার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি, ফলে গুলির হুমকির প্রশ্নই ওঠে না।
এসআই আরও বলেন, ‘ছেলেটি কলেজছাত্র এবং ভদ্র এই কথা বলে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমি স্যারকে অনুরোধ করেছিলাম।’
জানতে চাইলে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহমেদ কবীর দাবি করেন, মামুন মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ পাঠিয়ে তাকে আটক করে থানায় আনা হয়। কিন্তু সঙ্গে কোনো মাদকদ্রব্য না পাওয়ায় তাকে পরদিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে হাজির করা হয়। আদালত তার রায় দিয়েছেন। থানা হাজতে হুমকির বিষয়টি তার জানা নেই।
এদিকে রোববার সকালে জেলা আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সভায় গুলির হুমকির প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যাবহার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজগর আলী।
সভায় উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের তিনি বলেন, ‘আপনারা (পুলিশ) গডফাদারদের না ধরে একজন কলেজছাত্রকে ধরেন। তার পায়ে গুলি করার নির্দেশ দেন। নিরাপরাধ ব্যক্তিকে ধরে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাজা দেন। এটা মেনে নেয়া যায় না।`
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. জহির রায়হান জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
মামুনের বাবা ইমমাইল হোসেন জানান, তিনি এ নিয়ে চার বার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনে পরাজিতরা তাকে এবং তার পরিবারকে শায়েস্তা করতে উঠে পড়ে লেগেছে। তারাই পুলিশকে ব্যবহার করে তার ছেলেকে এ ধরনের হেনস্তা করে থাকতে পারে বলে তার কাছে মনে হচ্ছে।
আল-মামুন সাগর/এফএ/জেআইএম