দেশজুড়ে

কুষ্টিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ মাসে ১৭ জনের মৃত্যু

কুষ্টিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে একেকটি তাজা প্রাণ। বিশেষ করে গত তিন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। আর আহত হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথযাত্রী হয়েছেন অসংখ্য মানুষ।

সড়কের বেহাল দশা, অদক্ষ চালক, বিধি না মানাসহ অবৈধ নছিমন-করিমনের দৌরাত্ম দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সড়ক বিভাগসহ সড়কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদাসীনতাকেও এর জন্য দায়ী।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত জেলার ছয় উপজেলা এলাকার মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মারা গেছে কমপক্ষে ১৭ জন। এদের মধ্যে জানুয়ারি মাসে পাঁচজন, ফেব্রুয়ারি মাসে চারজন, মার্চ মাসে পাঁচজন এবং চলতি মাসে তিনজন।

এর মধ্যে গত ২ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আতিকুজ্জামান হেলাল (৩৩) নিহত হন। ওইদিন দুপুরে কুষ্টিয়া শহর থেকে মোটরসাইকেল যোগে বাড়ি ফেরার পথে মঙ্গলবাড়িয়া বাজারে একটি বালু ভর্তি ট্রাক তাকে ধাক্কা দিলে তিনি ছিটকে ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মারা যান।

গত ৬ জানুয়ারি বিকেলে কুমারখালী উপজেলার বাঁধ বাজার এলাকায় ক্যানেল পাড়ে সড়কে ট্রাকের ডালা খুলে তানজিল (৮) নামের এক শিশু ঘটনাস্থলেই মারা যায়। ওইদিন সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়কের সদরপুর মাদরাসা বাজারে মোটরসাইকেল আরোহী মামুন (৩০) মেহেরপুরগামী একটি পিকআপের ধাক্কায় রাস্তায় পড়ে গেলে ওই মুহূর্তে সবজি বোঝাই একটি ট্রাক তাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিহত মামুন মিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিনের ভাগ্নে।

২২ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার মিরপুরে স্কুলে যাওয়ার পথে কুর্শা পুলপাড়া নামক স্থানে একটি ট্রলি ধাক্কা দিলে স্কুলছাত্র শাকিল আহমেদ (১১) মারাত্মক আহত হয়। প্রথমে কুষ্টিয়া এবং পরবর্তীতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। শাকিল পুলপাড়ার নুরুলের ছেলে।

২৬ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কুষ্টিয়া-পাবনা মহাসড়কের নওদা গোপালপুর এলাকায় একটি ট্রাক মোটরসাইকেল আরোহী ইফতেখার উদ্দিনকে (৩৫) ধাক্কা দিলে সে মারাত্মক আহত হন। পরে কুষ্টিয়া হাসপাতালে মারা যান। ইফতেখার তালবাড়িয়া গ্রামের হাজী ইয়ারউদ্দিনের ছেলে।

১০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকালে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের গজনবীপুর এলাকায় কাভার্ড ভ্যানের ঢাক্কায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখার কর্মচারী আমিরুল ইসলাম বকুল ( ৪৮) ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী সানোয়ার হোসেন (৪৫) নিহত হন। তারা মোটর সাইকেল যোগে যাওয়ার পথে কাভার্ড ভ্যান চাপা দিয়ে চলে যায়।

১৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে মিরপুর উপজেলার নওদাপাড়া এলাকায় কুষ্টিয়া- মেহেরপুর সড়কে দ্রুতগামী একটি ট্রাক মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিলে আরোহী পলাশ ( ২৪) আহত হয়। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তিনি মারা যান।

২৩ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বিত্তিপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০শিক্ষার্থী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।

৩ মার্চ সকালে কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়কের মিরপুর বাসস্ট্যান্ডে ট্রাকচাপায় এক মহিলার মৃত্যু হয়।

১১মার্চ ভোরে কুষ্টিয়া-রাজশাহী মহাসড়কের মিরপুর সাতমাইল এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস উল্টে খাদে পড়ে দুইজন নিহত এবং অর্ধ শতাধিক আহত হন। নিহতরা হলেন- আব্দুল মজিদ ( ৬০) ও উমেদ আলী (৫৫)। হতাহতরা কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।

৪ মার্চ সকালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মোটরসাইকেল ও পাখি ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে হিটু (৩৮) নামের মোটরসাইকলে আরোহী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

৪ মার্চ দুপুর ১২টার দিকে কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়কের কচুবাড়িয়া এলাকায় বাসের চাকা ফেটে দুর্ঘটনায় ৩০ জন মত আহত হন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।

১৬ মার্চ সকাল ১১টার দিকে ঝাউদিয়া গ্রামে ট্রাকের চাপায় জামিরুল (২৭) নামের এক বাইসাইকেল আরেহী নিহত হন।

২৯ মার্চ দুপুরে কুষ্টিয়া শহরের কুষ্টিয়া-রাজশাহী মহাসড়কে বারখাদা প্লাইউড কারখানার সামনে মোটরসাইকেলযোগে কুষ্টিয়া শহরে যাওয়ার পথে মিরপুরের হল বাজারের কার্তিক বিশ্বাসের ছেলে সুশীল কুমার বিশ্বাস (৫৫) ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মারা যান।

৩ এপ্রিল দুপুরে আমলা-পোড়াদহ সড়কের গোবিন্দপুর গ্রামে মোটরসাইকেল ও ইঞ্জিনচালিত গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে তুজানুর রহমান (৩২) নামের একজন মারা যান।

৮ এপ্রিল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইলিয়াস কাঞ্চন (২৬) নামের এক ছাত্র মারা যান।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার দুপুরে সদর উপজেলার আলামপুরে ট্রাকচাপায় সাইদুল ইসলাম (২৬) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের আলামপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত সাইদুল সদর উপজেলার হরিশংকরপুর এলাকার বাবুর ছেলে।

সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে সড়কের বেহাল অবস্থা, বিধি বিধান না মানা, অবৈধ যানবাহন চলাচল, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং দ্রুত গতিতে মোটরসাইকেল চালানোও অন্যতম কারণ। তবে স্থানীয় প্রশাসন থেকে এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।

এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা “নিরাপদ সড়ক চাই” সংগঠনের নেতৃবৃন্দ হতাশার কথা জানিয়েছেন। সংগঠনের জেলা সভাপতি কেএম জাহিদ জানান, সড়ক দুর্ঘটনারোধে কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই।

আল-মামুন সাগর/আরএআর/পিআর