আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেত্রকোনার খালিয়াজুরী এলাকা পরিদর্শনে আগামী বৃহস্পতিবার নেত্রকোনা যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বন্যায় বোরো ফসলহানির পর প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মত নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলা সদরে কৃষকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করবেন। পরে তিনি স্থানীয় কলেজ মাঠে সমাবেশে বক্তব্য দেবেন।
ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে মার্চের ২৯ তারিখ থেকে কয়েক দিনের ব্যবধানে পাউবোর অসমাপ্ত বেরি বাঁধ দিয়ে ঢলের পানির তোড়ে তলিয়ে যায় জেলার সব সাত উপজেলার প্রায় ৭৩ হাজার (সরকারি হিসেবে) আবাদকৃত বোরো ধান।
দুর্যোগ ব্যবস্থানা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে নেত্রকোনা জেলায় পাঁচ হাজার ২৫৫ মেট্রিক টন চাল ও প্রত্যেককে পাঁচশ টাকা করে প্রদানের জন্য মোট পৌনে আট কোটি টাকা ইতিমধ্যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
সরকারি হিসেবে জেলায় এক লাখ ৭৪ হাজার ৯৪৫জন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ৫০ হাজার ভিজিএফ কার্ড দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাকি কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। গত দেড় মাসে নিজেদের খাদ্যেরর মজুদ শেষ হওয়ায় অনেকেই স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাড়িঘর ছেড়ে কাজের উদ্দেশ্যে এলাকা ছেড়েছেন। যদিও প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে অনেকেই আশার আলো দেখছেন।
আগাম বন্যায় ফসলহানির প্রভাব পড়েছে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। অভাবের তাড়নায় শিক্ষার্থীরা চলে যাচ্ছে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন এলাকার কর্মক্ষেত্রে। খালি হতে শুরু করেছে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রশংসাপত্রের জন্য ভিড় বাড়ছে প্রতিষ্ঠানসহ জনপ্রতিনিধিদের কার্যালয়েও। এভাবে চলতে থাকলে হুমকিতে পড়বে হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা।
খালিয়াজুরীর সিদ্দিকুর রহমান বালিকা বিদ্যানিকেতনের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ও কৃষ্ণপুর গ্রামের দিপালী রানী বর্মণের মেয়ে সূচনা বর্মণ অভাবের তাড়নায় তিন বোনসহ স্কুল ছেড়ে চাকরি নিয়েছে গাজিপুরের একটি গার্মেন্টসে। তার মতো এই স্কুলের অন্তত ৩০/৪০ ভাগ শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে অভাবের তাড়নায় কোনো পথ না পেয়ে স্কুল ছেড়েছে। এই স্কুলের ২৩০শিক্ষার্থীর মধ্যে বিদ্যালয়ে আছে মাত্র ৮০ জন। নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি এই শিক্ষার্থী।
বিদ্যালয় ছেড়ে যেতে প্রশংসাপত্রের জন্য ভিড় বাড়ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ জনপ্রতিনিধিদের কার্যালয়েও। তারা বিষয়টি স্থানীয়দের বুঝাতে ব্যর্থ হচ্ছেন বলে জাগো নিউজকে জানান সিদ্দিকুর রহমান বালিকা বিদ্যানিকেতনের প্রধান শিক্ষক দিপংকর দত্ত রায় । তাই তারা জরুরি ভিত্তিতে সরকারি সহযোগিতা চাচ্ছেন।
অভাবের তাড়নায় প্রতিদিন চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ জন লোক এলাকা ছাড়ছেন বলে জাগো নিউজকে জানান খালিয়াজুরী সদরের ইউপি চেয়ারম্যান মো. ছানোয়ারুজ্জামন যোসেফ। তিনি জানান, প্রতিদিনই বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ায় এসব লোককে নাগরিকত্বে সনদ দিতে হচ্ছে।
জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শত ভাগ উপবৃত্তিসহ মিডডে মেইল চালুর দাবি করেন খালিয়াজুরী কলেজের প্রিন্সিপাল মণিভূষণ সরকার।
ফসলহানির পর থেকে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া শুরু করেছে স্বীকার করে সরকারি সহযোগিতা পেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে জাগো নিউজকে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন।
নেত্রকোনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রশান্ত কুমার রায় জাগো নিউজকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস আসবে। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সেও বলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত একজন মানুষকেও না খেয়ে থাকতে হবে না। এরইমধ্যে ৫০ হাজার জেলের তালিকা করা হয়েছে। কৃষকদের পাশাপাশি জেলেদেরকেও সহযোগিতা করবে সরকার।
জেলা প্রশাসক ড. মুফফিকুর রহমান জাগো নিউজকে জানান, নেত্রকোনায় ৭২ জন ওএমএস ডিলারের মাধ্যমে খোলা বাজারে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল, ১৭ টাকা কেজি দরে আটা বিক্রি হচ্ছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ ও দরিদ্র মানুষ এই চাল ও আটা ক্রয় করছেন।
কামাল হোসাইন/আরএআর/পিআর