সরকারিভাবে মূল্য নির্ধারিত ৩৪ টাকা কেজি দরে সরকারি গুদামে চাল সরবরাহে অনিহা প্রকাশ করেছেন নওগাঁর চালকল মালিকরা। মঙ্গলবার দুপুরে এ সংক্রান্ত এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
জানা গেছে, ধান-চালের বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে সরকারিভাবে বেধে দেয়া দরের কোনো সামঞ্জস্য নেই। হাট থেকে ধান কিনে চাল করতে প্রতি কেজিতে খরচ পড়ছে প্রায় ৩৮/৩৯ টাকা। এ অবস্থায় গুদামে চাল দিতে গেলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।
হাওড়ে বন্যা এবং বৈরি আবহাওয়ায় ঝড়-বৃষ্টিতে বোরো আবাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হাওড় থেকে উৎপাদিত ধান দেশের প্রায় ২৫/৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কৃষকরা ঠিকমতো ধান ঘরে তুলতে পারেনি। ধান পাকার আগেই আধাপাকা ও কাঁচা ধান কেটে জমি থেকে ঘরে তুলতে হয়েছে। ফলে ধানের ফলনেরও বিপর্যয় হয়েছে। প্রতিবছর যেখানে ভরা মৌসুমে বোরো ধান হাট-বাজারে বিক্রি হয় এবার তা ব্যতিক্রম। নিত্যান্ত প্রয়োজন ছাড়া কৃষকরা ধান বিক্রি করছেন না। বাজারে যে পরিমাণ ধান আসছে ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা করে ধান কিনতে হচ্ছে। ভরা মৌসুমে যেখানে নতুন ধান ৬০০-৭০০ টাকা বিক্রি হতো। এবার কাঁচা নতুন ধান ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা করে কিনতে হচ্ছে ৮৫০-৯০০ টাকা দরে।
গত ২মে থেকে সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ শুরু হবার কথা ছিলো। কিন্তু সরকারের বেধে দেয়া মূল্যে গোডাউনে চাল সরবরাহ করতে গেলে ব্যাপক লোকসানে পড়তে হবে মিলারদের। ফলে এখন পর্যন্ত চাল সরবরাহের জন্য কোনো মিলাররা চুক্তি করেননি। নতুন করে চালের মূল্য নির্ধারণ করা না হলে কেউ চাল সরবরাহের চুক্তি করবেন না বলে জানিয়েছেন চালকল মালিকরা।
গত ২০১৬ সালে সরকারি মূল্যে গোডাউনে চাল সরবরাহ করতে গিয়ে অনেক মিলার লোকসানের দায়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। শুধুমাত্র মিলের লাইসেন্স টিকিয়ে রাখার জন্য গত বছর চাল সরবরাহ করেছেন চুক্তিবদ্ধ চালকল মালিকরা। সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর এই বছরও যদি লোকসান দিয়ে চাল দিতে হয় তাহলে চালকল মালিকদের পথে বসতে হবে।
মিলের লাইসেন্সতো দুরের কথা মিল বিক্রি করে হলেও চাল সরবরাহ করতে হবে চালকল মালিকদের। এ জন্য পুনরায় চালের দর বেধে দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান চালকল মালিকরা।
মেসার্স ফরিদ অ্যান্ড সুলতান ট্রের্ডাসের স্বত্বাধিকারী শেখ ফরিদ হোসেন বলেন, প্রতি বছর বোরো মৌসুমে চালের দাম কম থাকে। এবার তা ব্যতিক্রম। ধান বাজারে আসার আগেই সরকারিভাবে ২৪ টাকা কেজি দরে মূল্য নির্ধারণ করায় বাজারে ধানের আমদানি কম। কিছু কিছু চালকল মালিকরা প্রতিযোগিতা করে প্রতিমণ ধান ৮৫০-৯২০ টাকা দরে কিনছেন। চালের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় চালের বাজার দরও বেশি। তবে বাইরে চালের দাম বেশি হওয়ায় সরকারের মূল্য কম হওয়ায় চালকল মালিকরা অনিহা প্রকাশ করছেন।
নওগাঁ ধান চাল আড়ৎদার সভাপতি নিরদ বরণ সাহা চন্দন বলেন, বোরো ধানের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করতে সরকারকে চাল আমদানি করা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নাই। ভরা মৌসুমে যেখানে চালের দাম কমে যাওয়া কথা সেখানে বাজার ঊর্ধ্বমুখী।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি আলহাজ রফিকুল ইসলাম বলেন, বাজারে ধানের যা মূল্য সে হিসেবে ধান কিনে গোডাউনে চাল সরবরাহ করতে গেলে প্রতি কেজি চালে ৪/৫ টাকা লোকসান হবে। এজন্য সরকার কর্তৃক চালের মূল্য নতুন করে নির্ধারনের জন্য গত ৪ মে জেলা চালকল মালিক সমিতির সভায় সিদ্ধান্তক্রমে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য একটি লিখিত দরখাস্ত জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাড়া না পাওয়ায় দুপুরে পুণরায় জরুরী সভায় সিদ্ধান্ত হয়। যেখানে নতুন করে চালের মূল্য নির্ধারণ করা না হলে গোডাউনে চাল সরবরাহ করবেনা চালকল মালিকরা।
জেলা সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোহাজের হাসান বলেন, এ বছর জেলায় ৪২ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল কেনা হবে। ২ মে থেকে চাল কেনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত কোনো চালকল মালিক চুক্তিবদ্ধ হয়নি। তবে ২০ মে পর্যন্ত সময় আছে। এ সময়ের মধ্যে চুক্তিবদ্ধ হতে পারে।
এমএএস/আরআইপি