শুক্রবার লংগদুর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যেতে পারেনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) তদন্ত দল। প্রশাসনের বাধায় রাঙামাটি শহর থেকে তাদের লংগদু সফর বাতিল করতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন তদন্ত দলের প্রধান ও বিএনপির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্ল্যাহ আল নোমান।
তবে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নান বলেছেন, সেটা ওনাদের রাজনৈতিক বক্তব্য। প্রশাসন থেকে এ ধরনের কোনো বাধা দেয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।
শুক্রবার দুপুরে জেলা বিএনপির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন আবদুল্ল্যাহ আল নোমান। এসময় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসহ এর পেছনে কী ছিল তার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির এই কেন্দ্রীয় নেতা।
স্থানীয় যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়নের মরদেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে ২ জুন রাঙামাটির লংগদু সদরের তিন পাহাড়ি গ্রামে হামলা, লুটপাট ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা।
এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা মোট ২১২। তার মধ্যে তিনটিলায় ৯৪, বাইট্যাপাড়ায় ৩০ এবং মানিকজোড় ছড়ায় ৮৮ পরিবার। ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে লংগদু থানায় মামলা করেছে। এতে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৩-৪শ জনকে আসামি করা হয়।
ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান এখনও চলছে।
লংগদুর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আবদুল্ল্যাহ আল নোমানের নেতৃত্বে বিএনপির একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দল বৃহস্পতিবার রাঙামাটি পৌঁছায়। বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে ৬ সদস্যের তদন্ত দলের অন্য সদস্যরা হলেন, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সুকমল বড়ুয়া, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির চট্টগ্রামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর শামীম, কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) মণীষ দেওয়ান ও রবীন্দ্র লাল চাকমা।
শুক্রবার সকালে তাদের লংগদুর ঘটনাস্থল যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রশাসনের অসহযোগ ভূমিকার কারণে যাওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা। পরে বিষয়টি নিয়ে জেলা বিএনপির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক দীপন তালুকদার, যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ মামুন, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম পনিরসহ জেলা নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্ল্যাহ আল নোমান জানান, আমি জেলা প্রশাসক, পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লংগদুর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করি এবং সহযোগিতা চেয়েছি।
কিন্তু সব স্তরের প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, সেখানকার পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। গেলে যেতে পারেন কিন্তু কোনো অঘটন কিছু ঘটলে দায় নিজেদের বহন করতে হবে। প্রশাসন এর কোনো দায়-দায়িত্ব নিতে পারবে না। প্রশাসন থেকে এ ধরনের কথাবার্তা বলা হলে আমাদের আর লংগদু যাওয়ার কোনো পরিস্থিতি থাকার কথা নয়। বরং এসব কথা বলে আমাদেরকে প্রকাশ্য বা পরোক্ষভাবে লংগদু যেতে বাঁধা দেয়া হয়েছে। ফলে আমাদের লংগদু পরিদর্শনের সফর বাতিল করতে হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ক্ষমতাসীন সরকার লংগদুর ঘটনা নিয়ে নোংরা রাজনীতিতে জড়িত। ঘটনার সপ্তাহের পরও প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে লংগদুর পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। সেই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি কী আমরা তা জানতে চাই। আমরা চাই দ্রুত লংগদুর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হোক।
সেখান থেকে বৃহস্পতিবার আরেকটি অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে জেনেছেন উল্লেখ করে আবদুল্ল্যাহ আল নোমান বলেন, আসলে পুরো ঘটনার পেছনে ভয়াবহ রহস্য আছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য নয়ন হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থার উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো সেটিকে কেন্দ্র করে নিরীহ পাহাড়িদের বাড়িঘর আগুনে পোড়ানো হয়েছে।
আমরা শুনেছি ঘটনার সময় কিছু মা, বোনের শ্লীলতাহানির চেষ্টাও করা হয়েছে। আমরা শান্তি ও সম্প্রীতি চাই। এখানে শান্তিতে থাকতে হলে পাহাড়ি বাঙালি মিলেমিশে সম্প্রীতি নিয়ে বসবাস করতে হবে। তাই লংগদুতে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে এনে সেখানে পাহাড়ি বাঙালি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান পুন:স্থাপন করতে হবে। এজন্য সরকারকে দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আবদুল্ল্যাহ আল নোমান বলেন, জনগণ পুলিশি মামলা, সরকার বা প্রশাসনের তদন্ত বিশ্বাস করে না। কেবল নিরপেক্ষ ও বিচার বিভাগীয় তদন্তে লংগদু ঘটনার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, লংগদুতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের আর্থিক সহায়তার জন্য প্রাথমিকভাবে দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ হতে নগদ ৫ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া নিহত নয়নের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার জন্য ৫০ হাজার পাঠানো হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থলে যেতে না পারায় এসব অনুদানের অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণের জন্য জেলা বিএনপির কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেছি।
সুশীল প্রসাদ চাকমা/এফএ/পিআর