লক্ষ্মীপুরে মাটি কাটার শ্রমিক নূরুল আমিনকে (৫২) গ্রাম্য সালিশে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ও নাকে খত দিতে বাধ্য করার ঘটনায় চন্দ্রগঞ্জ থানা পুলিশের ওসি ও ইউপি চেয়ারম্যানকে সুপ্রিম কোর্টে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. তাছেব হোসাইনের করা জনস্বার্থে রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর দ্বৈত অবকাশকালীন বেঞ্চ বুধবার দুপুরে এ রুল দেন।
রিটকারী আইনজীবী মো. তাছেব হোসাইন জানান, আদালত নির্যাতিত পরিবারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপারকে (এসপি) নির্দেশ দিয়েছেন। এসময় চন্দ্রগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও দত্তপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আহসানুল কবির রিপনকে ৩ জুলাই হাইকোর্টে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে ওই পরিবারকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য এসপিকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
১৭ জুন জাগো নিউজে ‘এ কেমন বিচার! ’ শিরোনামে এবং কয়েকটি গণমাধ্যমে ছবিসহ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। জনস্বার্থে আদালতের নজরে এনে আইনজীবী মো. তাছেব হোসাইন রিট মামলা (৯১৮০/২০১৭) দায়ের করেন। আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এদিকে প্রকাশিত সংবাদ দেখে তাৎক্ষণিক লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হোমায়রা বেগম একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ নুরুজ্জামানকে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য তিনি চিঠি দেন।
বুধবার বেলা ৩টার দিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় দেড় শতাধিক লোক উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় নির্যাতিত ব্যক্তিকে আমার কার্যালয়ে এসে তার গোপনে বক্তব্য দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সদর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক আহসানুল কবির রিপন গত ২৯ মে গ্রাম্য সালিসে শ্রমিক নূরুল আমিনকে বাড়ি থেকে ধরে এনে প্রকাশ্যে নাকে খত দিতে বাধ্য করেন। এসময় তার (চেয়ারম্যান) নির্দেশে গ্রাম পুলিশ জাহাঙ্গীর আলম ওই শ্রমিককে ১০ থেকে ১১টি বেত্রাঘাত করেন। অভিযোগকারী শহীদ ও তার স্ত্রী পায়ে ধরে দু’দফায় ক্ষমা চেয়েও রক্ষা পাননি তিনি।
শহিদ নামে আরেক মাটি কাটা শ্রমিকের সঙ্গে বিবাধকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করলে তিনি ইউনিয়নের বড় আউলিয়া গ্রামে সালিসের আয়োজন করেন। সেখানে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বুলবুল ইসলাম খান, নির্যাতিত নূরুল আমিনের স্ত্রী-সন্তানসহ শতাধিক গ্রামবাসী উপস্থিত ছিলেন।
সালিসের দুইদিন পর নুরুল আমিনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। স্থানীয় এক ব্যক্তির গোপনে ধারণ করা এক মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের সালিসে নির্যাতনের ভিডিওটি ১৬ জুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এনিয়ে স্থানীয় প্রশাসনসহ সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়। ঘটনার পর থেকে নির্যাতিত নূরুল আমিনের পরিবারটি লোকলজ্জায় মানসিকভাবে বির্ধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্যরা ঘর থেকে তেমন বের হন না। চেয়ারম্যান ও তার অনুসারীদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে তারা।
কাজল কায়েস/এফএইচ/এমএএস/আরআইপি