দেশজুড়ে

গাইবান্ধায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত

গাইবান্ধায় ক্রমাগত নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অবনতির দিকে রয়েছে। নতুন নতুন এলাকা পানিতে প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। 

বিদ্যালয়ের মাঠ ও রাস্তাঘাট পানিতে প্লাবিত হওয়ায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বন্যার পানি বেড়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের মানুষ।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে ফুলছড়ি পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার  ও ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে বিপদসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

এছাড়া করতোয়া ও তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে জেলায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৩৩ দশমিক ০০ মিলিমিটার। 

এর আগে সোমবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের মিয়াপাড়া, পূর্বকোমরনই, ঘাগোয়া ইউনিয়নের হাতিয়া, ভাটিয়াপাড়া, তালতলা, পঁচারকুঁড়া, গিদারী ইউনিয়নের আনালের ছড়া, ধুতিচোরা ও কামারজানি ইউনিয়নের গোঘাটসহ নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো পানিতে প্লাবিত হয়েছে। অসংখ্য রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি ডুবে গেছে। 

অনেক বাড়ির আঙ্গিনায় পানি উঠেছে। ফলে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বৃষ্টি ও পানির স্রোতে অনেক জায়গায় কাঁচা রাস্তা ভেঙে গেছে। ফলে যানবাহনের সড়কপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক স্থানে মানুষ টানা বাঁশের সাঁকো তৈরি করে চলাচল করছে। চরাঞ্চলে পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ঘর-বাড়ি ভেঙে নিয়ে যাচ্ছেন উঁচু স্থানে। 

হাতিয়া ও ধুতিচোরা গ্রামের সাজু মিয়া (৩৮) ও আব্দুল আউয়াল (৪২) বলেন, বন্যার পানিতে চারদিন থেকে রাস্তা-ঘাট ডুবে গেছে । চলাচলে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বাড়ির আশেপাশে সাপসহ বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়েছে। পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে মনে হয় বাঁধে আশ্রয় নিতে হবে।  

কামারজানি চরের সেলিম মিয়া (৫২) বলেন, চরে ঘর ছিল। সে ঘরে এখন হাঁটু পানির উপরে। তাই ঘর ভেঙে নিয়ে এসেছি। প্রতিবছর বন্যায় চরে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। তাই ডাকাত আতঙ্কে রয়েছে চরাঞ্চলের মানুষ।

এছাড়া জেলার সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার নদী তীরবর্তী ১৬টি ইউনিয়নের ১৭ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে নিম্নাঞ্চলের অনেক নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। 

ফলে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মানুষ নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্র ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ উঁচু স্থানগুলোতে আশ্রয় নেয়া শুরু করেছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে মঙ্গলবার সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বন্যার্ত এলাকার মানুষদের আরও দুর্ভোগ বেড়েছে। 

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ধানের বীজতলা, শাক-সবজি, পাটক্ষেতসহ ফসলের ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। এবার ৫ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। বন্যা পরবর্তী সময়ে ধানের চারার কোনো সমস্যা হবে না। 

গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. মো. আমির আলী বলেন, মেডিকেল টিমের সদস্যরা বন্যাদুর্গত এলাকায় কাজ করছে। এবার বন্যাদুর্গত সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামীকাল সেগুলো পৌঁছে দেয়া হবে। বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে কার্বোলিক এসিডের বোতলের মুখ খুলে ঘরের আশেপাশে রাখতে হবে। 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম মন্ডল বলেন, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের ৩৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পানি উঠেছে। সেই সঙ্গে আরও ৫২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ও রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যালয়গুলো খুলে দেয়ার জন্য প্রধান শিক্ষকদের বলা হয়েছে। 

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ইদ্রিশ আলী বলেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত ৯০ মেট্রিক টন চাল ও ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চার উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের ১৭ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। 

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত শনিবার ও রোববার পানি স্থির থাকলেও সোমবার সকাল থেকেই নদ-নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এছাড়া শহর রক্ষা বাঁধ পাহারা দেয়ার জন্য পুলিশ ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা কাজ করবে। পাশাপাশি অন্যান্য বাঁধ পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন পাহারা দিচ্ছে। যেখানে সমস্যা মনে হচ্ছে সেখানে জরুরিভাবে কাজ করা হচ্ছে। 

গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, বন্যার সময় চরাঞ্চলগুলোতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। তাই নদী তীরবর্তী চারটি উপজেলায় আটটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক নদীতে টহল দিচ্ছে। এছাড়া জরুরি মুহূর্তে জেলা পুলিশের ৩টি স্পিডবোট ব্যবহার করা হচ্ছে। 

রওশন আলম পাপুল/এএম/এমএস