কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগছে মেয়েটি। বাবা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বলেছিল, ‘মা’ তোমার জন্য কী নিয়ে আসব। মাও বাবাকে বলেছিল আমার জন্য কোনো কিছু আনতে হবে না, শুধু জ্বরের ওষুধ নিয়ে আসবেন।
কিন্তু বাবা আর ফিরে আসলেন না। বাবাকে ওরা মেরে ফেলেছে। আমি ওষুধ চাই না, আমি আমার বাবাকে ফেরত চাই। বাবার খুনিদের ফাঁসি চাই।
এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিল খুন হওয়া স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আব্দুল মান্নানের মেয়ে মাওয়া আক্তার (১০)।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের অর্থ-বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মান্নান খুনের ঘটনায় পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত আব্দুল মান্নানের মৃত্যুতে স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
পরিবারের স্বজন ও এলাকাবাসী খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত যুবলীগ নেতা সজীব দত্ত ও তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।
নিহত আব্দুল মান্নানের মা রেজিয়া বেওয়া বলেন, আমার ছেলেকে যারা মেরেছে, তাদের ফাঁসি চাই। মান্নানের মৃত্যুর পরে এখন তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আমি কোথায় যাব?
নিহতের স্ত্রী জেমসিন আক্তার বলেন, আমার স্বামী ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। দুই কন্যাশিশুকে নিয়ে এখন আমাকে পথে বসতে হবে। আমার স্বামীর হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।
নিহত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আব্দুল মান্নান দুই কন্যাসন্তানের জনক। তার অনাকাঙ্ক্ষিত খুনের ঘটনায় পরিবারের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে বলে নিহত মান্নানের স্ত্রী জেসমিন আক্তার দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন।
পুলিশ বুধবার ভোর পর্যন্ত খুনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুজনকে আটক করছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
আটকরা হলেন যুবলীগ নেতা সজীব দত্তের বড় ভাই পিন্টু দত্ত (৩৫) ও শান্তর বড় ভাই রতন (৪০)।
পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। এখন পর্যন্ত খুনের সঙ্গে জড়িত মূলহোতাদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপার জানান, খুনের সঙ্গে জড়িতদের পুলিশ চিহ্নিত করেছে। দোষীদের গ্রেফতারের জন্য বিশেষ অভিযান চলছে।
উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সজীব দত্তের সঙ্গে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের অর্থ-বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মান্নানের টেন্ডার ও টোল আদায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।
কয়েকদিন আগে সিগারেট খাওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এ সময় যুবলীগ নেতা সজীব দত্ত মান্নানকে পরে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে আব্দুল মান্নান সজীব দত্তের বড় ভাই জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ দত্তকে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি তার ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলে ও মান্নানকে সাবধান করে দেন বলে ওই সময় উপস্থিত অনেকে বলেছেন।
ওই ঘটনার জের ধরে যুবলীগ নেতা সজীব দত্ত মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় আব্দুল মান্নানকে শহরের মুন্সিরহাট এলাকায় দেখে পেছন থেকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন।
একপর্যায়ে মান্নান মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় আব্দুল মান্নানকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে এলে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জুম্মনকে সজীব দত্ত ছুরিকাঘাত করে মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যান।
স্থানীয় লোকজন আব্দুল মান্নান ও জুম্মনকে উদ্ধার করে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে আনার পথে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে পথিমধ্যে মান্নান মারা যান। আর জুম্মনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
খুনের সঙ্গে জড়িতের অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা সজীব দত্তের বড় ভাই জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ দত্ত সমীর পলাতক। সমীর দত্তের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল ও পুলিশ সুপার ফারহাত আহমেদ হতাহতদের খোঁজ নিতে গিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের আশ্বাস দেন।
এ ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে। খুনের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো।
অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে হাসপাতালে ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মো. রবিউল এহসান রিপন/এএম/পিআর