দেশজুড়ে

তৃষ্ণায় বুক ফাটছে ওদের

বিশুদ্ধ পানির অভাবে তৃষ্ণায় বুক ফাটছে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার দেড় লাখ মানুষের। শুষ্ক মৌসুমে খাল-বিল থেকে সংগ্রহ করা লবণাক্ত পানি ব্যবহার করে এ উপজেলার অসংখ্য মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।দীর্ঘদিনেও অবহেলিত এ জনপদের মানুষের পানির চাহিদা মেটাতে নেয়া হয়নি কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ।প্রমত্তা বলেশ্বর পাড় ঘেঁষে জেলার সর্বদক্ষিণে শরণখোলা উপজেলার অবস্থান।এ উপজেলার ধানসাগড়, খোন্তাকাটা, রায়েন্দা ও সাউথখালী ইউনিয়নের সবত্রই লবণাক্ত পানি। ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই লবণাক্ত পানি পান করতে হয় তাদের। এ কারণে পানিবাহিত রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এখানকার মানুষ।এদিকে চলতি শুষ্ক মৌসুমে শরণখোলায় ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে দেড়শতাধিক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু ও বৃদ্ধ। এ অবস্থায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মোকাবেলায় অগ্রিম সতর্কতা হিসেবে ৫টি মেডিকেল টিম গঠন করেছে। শরণখোলা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে উপজেলার পূর্ব-খাদার বাসিন্দা হালিম (৬৫), নলবুনিয়ার জাহানারা বেগম (৫৫), গোলবুনিয়ার আবু-হানিফ (৬০), তাফালবাড়ির ৬ মাস বয়সী অপু, খোন্তাকাটার ৮ মাস বয়সী খালিদ, খাদা গ্রামে ৮ মাসের শিশু ফাহিম ও কদমতলা এলাকার ৮ মাস বয়সী শুনিয়াসহ প্রায় দেড়শ রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে। এছাড়াও তীব্র গরমে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।জানা গেছে, উপকূলীয় এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পানি সংকট নিরসনের জন্য ২০০৭ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় সুপার সাইক্লোন সিড়র পরবর্তী সময় এঅঞ্চলে সরকারি, বে-সরকারি উদ্যোগে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ৪টি ইউনিয়নে প্রায় সহস্রাধিক রেইনওয়াটার হারবেস্ট্রেরিং ও পিএসএফ (পন্ড সেন্ড ফিল্টার) নির্মাণ করা হয়। অনেকটা তড়িঘড়ি ও দায়সারা গোছের কাজ হওয়ায় বিভিন্ন সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নির্মিত পানি সরবরাহের পিএসএফগুলোর ৯৫ ভাগ ইতোমধ্যে অকেজো হয়ে পড়েছে। যা এলাকাবাসীর কোনো উপকারে আসছেনা। শরণখোলা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী (পাবলিক হেলথ) সূত্র জানা গেছে, তাদের স্থাপিত ৪টি ইউনিয়নে ২০১৫টি টিউবওয়েলের মধ্যে অধিকাংশই নষ্ট। ২/১টি ভালো থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে তাতে পানি পাওয়া যাচ্ছেনা। আবার কোনো কোনো টিউবওয়েলে পানি পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এলাকাবাসী তা ব্যবহার করছেন না। এমনকি সেখানে নতুন করে টিউবওয়েল স্থাপন করা যাচ্ছেনা। উপজেলার পূর্বখাদা গ্রামের বাসিন্দা স্কুলছাত্রী আসমা আক্তার সুমি (১৪) জানায়, বাড়ির কাছাকাছি ভালো কোনো পানির ফিল্টার না থাকায় প্রতিদিন ১ কিলোমিটার দূরে পানি সংগ্রহ করতে যাই। উপজেলার খোন্তাকাটা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম জানান, তার এলাকায় কয়েকটি পিএসএফ থাকলেও সবগুলো নষ্ট। বাধ্য হয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় তার গ্রামের মানুষদের। কিন্তু, তাও শতভাগ নিরাপদ নয়। অনেকটা নিরুপায় হয়ে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তারা কিছুটা বিশুদ্ধ পানির আশায় এখানে ওখানে ছুটছেন।সুন্দরবন সংলগ্ন ৭নং রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, তার বিদ্যালয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য একটি ট্যাঙ্ক ছিল। গত ২ মাস আগে সেই ট্যাঙ্কের পানি শেষ হয়ে যাওয়ায় স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রীসহ শিক্ষক কর্মচারীরা তাদের বাড়ি থেকে পানি নিয়ে আসেন। সাউথখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. ফরিদ খাঁন মিন্টু জানান, তার এলাকার পাশেই বলেশ্বর নদী। সেখানে অনেক পানি থাকলেও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। এছাড়া সিড়র পরবর্তী সময় নির্মাণাধীন পিএসএফগুলোর যে বেহাল অবস্থা তা এলাকাবাসীর কোনো উপকারে আসছে না। স্থানীয় এনজিও জেজেএস এর ব্যক্তিগত একটি পানির পিএসএফ ভালো থাকায় লোকজন বিকেল হলেই দলে দলে সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করে। তিনি আরো জানান, পাবলিক হেলথ এর স্থাপিত টিউবওয়েলগুলো সবগুলোই নষ্ট।শরণখোলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাংবাদিক শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, শুষ্ক মৌসুম এলেই পানি সংকট দেখা দেয়। স্থানীয়ভাবে ব্যক্তি মালিকানায় ২টি পানি সরবরাহের প্রতিষ্ঠান থাকলেও তার মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। পানি সংকট নিরসনের জন্য সকলের সম্মিলিত উদ্দোগের প্রয়োজন। এ ব্যাপারে শরণখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের থানা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার জানান,পানি সংকটের কারণে ও প্রচণ্ড গরমে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও ভয়ের কারণ নেই। পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ব্যাপারে শরণখোলা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন বলেন, সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দসহ সাধারণ মানুষের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে হলে তার কার্যালয়ের জনবলসহ নানা সংকট দূর হওয়া প্রায়োজন।এমএএস/পিআর