গত ১২ আগস্ট পৃথিবীতে প্রথম আলোর মুখ দেখে একটি কন্যাশিশু। ছেলেসন্তানের পর কাঙ্ক্ষিত মেয়ে সন্তানের আগমনে পরিবারে তখন আনন্দ আর উচ্ছ্বাস।
কিন্তু মাঝ রাতে হঠাৎ করে গ্রামে বানের পানি ঢুকে পড়ল ঘরে। চারদিকে হৈ-চৈ আর আতঙ্ক। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে রাতেই পুরো গ্রামের বাড়িঘর পানিতে ডুবে যায়।
কুড়িগ্রাম সদরের পাঁচগাছি ইউনিয়নের উত্তর সিতাইঝাড় গ্রাম। এই গ্রামে মজনু মিয়ার (২৭) স্ত্রী ফারজিনা (২২) ওইদিন কন্যা সন্তানের জন্ম দেন।
পরদিন ১৩ আগস্ট একদিনের কন্যাসন্তানসহ মা-বাবাকে নিয়ে পাশের উত্তর নওয়াবশ বাঁধে আশ্রয় নিতে হয় তাকে। নানাবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাঁধ হয়েছিল শিশুকন্যাটির আতুরঘর। বাবা তখন বাড়িতে ছিলেন না।
রোববার যখন ফারজিনার বাড়িতে যাওয়া হয় তখন তার শিশুকন্যা কারিমার বয়স ১১ দিন। তিনদিন পর বাবা মজনু মিয়া বাড়িতে ফিরেন।
তিনি জানান, সংসারে অভাবের কারণে ঢাকায় রিকশা চালান। তার বাড়ি পাশের মরাটারী গ্রামে। প্রায় ছয় বছর আগে ফারজিনা বেগমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের প্রথম সন্তান ফরহাদের বয়স আড়াই বছর।
ফারজিনা জানান, জন্মের পরদিনই শিশুসহ বাবা-মাকে নিয়ে উত্তর সিতাইঝাড় বাঁধে আশ্রয় নিই। বাঁধই ছিল আমাদের আতুরঘর। দুর্বল শরীর। ঠিকমতো খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। খুব কষ্টে চারদিন পার করেছি। খোলা আকাশের নিচে শিশুর যত্ন নিতে পারিনি। বাঁধে চারদিন থাকার পর শ্বশুর বাড়ি যাই।
সেখানেও পানি ওঠায় একদিন পর আবার বাবার বাড়িতে ফিরে আসি। দৌড়াদৌড়ি করার ফলে মেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। গায়ে ফুসকুড়ির মতো কিছু উঠেছে।
ফারজিনার মতো আরেক দুর্ভাগা মায়ের নাম আনোয়ারা (২২)। ১০ দিন আগে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন তিনি। সন্তান আলামিনের যেদিন জন্ম সেদিন পুরো বালাডোবা গ্রাম ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে বাড়ি ছেড়ে নৗকায় আশ্রয় নিতে হয় প্রসূতি মাসহ সন্তানকে।
আনোয়ারার মা আকলিমা বেগম জানান, সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা, ঘরের পানি তখন চাল ছুঁই ছুঁই। সদ্য জন্ম নেয়া নাতিকে নিয়ে নৌকায় ওঠেন তারা। শিশু আলামিনের আতুরঘর হয় ডিঙি নৌকাতেই।
কথা বলে জানা যায়, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বালাডোবা গ্রামের আনোয়ারার সঙ্গে বিয়ে হয় বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর এলাকার বাসিন্দা মহুবরের (২৬) সঙ্গে। তিনিও পেশায় অটোরিকশাচালক।
আনোয়ারার বাবা আবু ছায়েম জানান, একদিকে পানি বাড়ছে, অপরদিকে সদ্যজাত নাতিকে নিয়ে চিন্তা। পানি হু-হু করে বাড়ার ফলে উপায় না পেয়ে সদ্যজাত মা-ছেলেকে ছোট্ট ডিঙি নৌকায় তুলে দেন তিনি। সে এক দুর্বিষহ দিন। প্রত্যেকটা দিন যেন এক একটা বছরের সমান। বানের পানি নেমে যাওয়ার পর যেন পুরো পরিবারে স্বস্তি ফিরে আসে।
এদিকে, বানের পানিকে থোড়াই পরোয়া করে যেসব শিশু পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখল। সেই শিশুদের জন্মের সময় পৃথিবীর মায়া ছাড়তে হল অনেককে। তাদের মধ্যে সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের সিতাইঝাড় গ্রামের পূর্বে উত্তর বালাডোবা গ্রামে অসুস্থ সঞ্জু ফকির (৪৭) শনিবার ভোরে মারা যান।
ভিক্ষা করেই তার ৮ সদস্যের টানাটানির সংসার। সম্প্রতি বড় ছেলে আরিফুল সংসারে যোগান দিতে টাঙ্গাইলে তাঁতের কাজে যোগ দেয়। বাবার মৃত্যুর খবর দেয়া হয়েছিল তাকে। সঞ্জু ফকিরকে বালাডোবা কানাপাড়া কবরস্থানে দাফনের জন্য কবর খোঁড়া হচ্ছিল। কিন্তু কিছুদূর খোঁড়ার পর কবর আবার জোয়ারের পানিতে ভরে যায়। ফলে তাকে কবর দিতে সমস্যা হয়।
স্থানীয় সূত্র মতে, কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেই সঙ্গে দুই শিশুর জন্ম হয়েছে বন্যার পানির ওপরই।
এই এলাকার মহু বাদশা জানান, এক সপ্তাহ ধরে এলাকার মানুষ পানিবন্দি। এখন পানি কমে গেছে। কিন্তু কবর খুঁড়লেই পানি বের হয়ে আসছে। ফলে মাটি দিতে সমস্যা হচ্ছে মৃতদের।
এবারের বন্যার পানি যেন সবকিছুকেই ছাপিয়ে গেছে। বানের পানিতে কারও মরদেহ পানিতে ভাসিয়ে দিতে হয়েছে। আবার বানের পানিতেই আলোর মুখ দেখছে সদ্যজাত শিশু। জীবন-মৃত্যুর খেলায় বন্যার পানি যেন মানুষকে এক নতুন উপলব্ধির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
নাজমুল হোসাইন/এএম/এমএস