দালালদের লোভনীয় ফাঁদে পড়ে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পথে পাড়ি জমানো জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার সুজাপুর গ্রামের ১ যুবক কোনো রকমে ফিরেছেন। তার নাম সামছুল ইসলাম (২৮)। সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে তিনি সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন সংসারের অভাব ঘোঁচাতে। ধার দেনা করে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দালালকে দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়া পৌঁছতে পারলেও স্বপ্নটা পূরণ হয়নি তার। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শরীরের একপাশ অবশ হয়ে গেছে, স্মৃতিশক্তিও নেই সামছুলের। এ অবস্থায় মালেশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা চাঁদা তুলে তাকে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ৯ মাস পর গত ৬ মে বাড়ি ফিরেছেন সামছুল। এখন তার দিন কাটে বিছানায় শুয়ে নয়তো হুইল চেয়ারে। সামছুলের স্ত্রী জলি বেগম জাগো নিউজকে বলেন, মালয়েশিয়া যাওয়ার পথেই তার ওপর চরম নির্যাতন চালানো হয়। সেখানে পৌঁছার পরও তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের কারণেই সামছুলের আজ এই দশা। সামছুল একসময় স্থানীয় ফুলদিঘী বাজারে কুলি হিসেবে কাজ করতেন। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় যান রিকশা চালাতে। সেখানে পরিচয় হয় বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার ধাপ এলাকার এক দালালের সঙ্গে। তার সঙ্গে চুক্তি করে সেখান থেকেই চট্টগ্রাম হয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যান সামছুল, বাড়িতেও কিছু জানাননি। মালয়েশিয়া পৌঁছে ফোন করে মুক্তিপণ হিসেবে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা পাঠাতে বলেন। ধার-দেনা করে সেই টাকা পাঠান জলি। পরিবারের সদস্যরা জানান, অবৈধভাবে যাওয়া প্রায় এক মাসে কাটে জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে। সেখানেই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয় সে। পরে কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ জোটে। সেখানে ভীষণ কষ্টে দিন কাটে তার। এ অবস্থায় মাস চারেক কাটান সামছুল। সেখানে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে মালয়েশিয়া থাকা এলাকার রবিউল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি সামছুলকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন। হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা দিয়েও কেনো উন্নতি না হলে তাকে দেশে পাঠানোর জন্য খরচের কথা জানিয়ে রবিউল সামছুেলর বাড়িতে খবর দেন। রবিউল জানান, সামছুলকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ৪০ হাজার টাকা লাগবে। ধার-দেনা করে সামছুলকে মালয়েশিয়া পাঠানো হয়েছে। তার ওপর আরো ৪০ হাজার টাকা জোগাড় করার সামর্থ্য তার পরিবারের ছিল না। এ অবস্থায় ওই গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসীরা চাঁদা তুলে অসুস্থ সামছুলকে দেশে পাঠান। সামছুলই তার সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এখন তার অচলাবস্থার সঙ্গে দুই সন্তান নিয়ে চরম দুর্দশায় পড়েছে পরিবারটি। নিজেদের জমানো অল্প কিছু টাকার সঙ্গে ধার-দেনা করে ২ লাখ টাকা মিলিয়ে সামছুল বিদেশে গিয়েছিলেন শুধু সংসারের অভাব দূর করতে। প্রথম কয়েক মাস সামান্য কিছু টাকাও পাঠিয়েছেন। কিন্ত অতি পরিশ্রমের নামে নানা নির্যাতনে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় কীভাবে সংসার চলবে ভেবে পাচ্ছি না। পরিবারের সদস্যদের দাবি, অবৈধ পথে মালয়েশিয়া গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েই সামছুল অসুস্থ হন, স্মৃতিশক্তিও হারিয়েছেন। সামছুল বাড়ি ফিরলেও পরিবার নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েন তার চিকিৎসার খরচ নিয়ে।পরিবারের পক্ষ থেকে সাহায্যের আবেদন জানালে এলাকাবাসী চিকিৎসার জন্য চাঁদা তোলেন। পরে স্থানীয় চিকিৎসক ডা. নারায়ন চন্দ্র পালের কাছে চিকিৎসা গ্রহণ করানো হয়। তারপরো তার শরীরের অবনতি হলে জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্ত তার আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য গত বৃহস্পতিবার রাতে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়। ক্ষেতলাল থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, নির্দেশনা মোতাবেক বিষয়ে তাদের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। দোষ প্রমানিত হলে দালালদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।ক্ষেতলাল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রওনকুল ইসলাম চৌধূরী টিপু জাগো নিউজকে বলেন, `দালালদের খপ্পরে পরে পানি পথে যারা বিদেশ গেছেন, তাদেরকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি আকুল আবেদন করছি।` জয়পুরহাট জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরো`র জনশক্তি জরিপ কর্মকর্তা খন্দকার আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, যারা পানি পথে বিদেশ গেছেন, তাদেরকে ফিরে আনার জন্য সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। তবে এরপর যারা বিদেশ যাবেন, অবশ্যই তাদেরকে নিবন্ধিত হয়েই বিদেশ যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। জয়পুরহাট পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, মানব পাচার বন্ধে আমরা সকলকে সচেতন করছি এবং আর যাতে কেউ দালালদের খপ্পরে না পরে এ ব্যাপারে আমরা গণসচেতনামূলক প্রচারণা চালাচ্ছি।এমজেড/এমএস