দেশজুড়ে

ছাত্রলীগ যেন রামগঞ্জে বাবালীগ!

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের ৫১ সদস্যের কমিটির কারোই এখন আর ছাত্রত্ব নেই। এদের মধ্যে অনেকেই বহু আগেই হয়েছেন একাধিক ছেলে-মেয়ের বাবা। এছাড়া নেতৃত্বে রয়েছে প্রবাসী, জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী।প্রায় একই অবস্থা পৌর ও সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের। সেখানেও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে কার্যক্রম। এছাড়া সংগঠনটির কয়েকজন নেতার পদ এখন শুধু মুখে-মুখে। আর নেতাদের অধিকাংশই সংসারের পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ছাত্রলীগ এখন যেনো বাবালীগে পরিণত হয়েছে।তবে নিজেদের মধ্যে কোন্দলে পিছিয়ে নেই `আদু` ভাইয়েরা। আধিপত্য নিয়ে অহরহ মারামারি, গোলাগুলি এমনকি প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দেওয়া যেনো তাদের কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। এছাড়া কয়েকজন মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও তাদের স্বার্থে ছাত্রলীগের এসব অপকর্ম মদদ দিচ্ছে বলে জানা গেছে।এদিকে, জেলা ছাত্রলীগের গত কমিটির (শেখ জামাল রিপন-মনিরুজ্জামান পাটোয়ারী) নেতারা একাধিকবার সম্মেলন করার কথা বললেও রহস্যজনক কারণে তা হয়নি। এতে পদ প্রত্যাশীরা হতাশ। এ অবস্থায় ঝিমিয়ে পড়া এ সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জেলা নেতারা উপজেলা কমিটি অনুমোদন করে। এ কমিটির সভাপতি সৈকত মাহমুদ শামছু বর্তমানে এক সন্তানের জনক, পেশায় তিনি ঠিকাদার। সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলাম সুমন, রাকিবুল হাছান মাসুদ বিবাহিত, সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান সুমন ভূঁইয়ার দুই সন্তান রয়েছে। যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাসুদ আলম মারা গেছেন, একই পদের মহসিন আউয়াল মঞ্জু বিয়ে করে সংসার শুরু করেছেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রশিদ আকন্দ বিবাহিত, আরেক সাংগঠনিক বেলায়েত হোসেন টুলু দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী।২০১২ সালে পৌর কমিটি অনুমোদন করা হয়। এর সহ-সভাপতি ফরহাদ হোসেন রাজু বিবাহিত, তিনি পৌর যুবলীগের ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক। সাংগঠনিক সম্পাদক রুবেল পাটোয়ারী বিবাহিত। ২০১০ সালে অনুমোদন পাওয়া সরকারি কলেজ কমিটির সভাপতি কামরুল হাছান বর্তমানে প্রবাসী, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আরাফাত হোসেন সজল বর্তমানে চাঁদাবাজি মামলায় কারাগারে, সহ-সভাপতি তারেক হাছান ইমু চাকরিজীবী, শাখায়াত হোসেন রাজু বিবাহিত, সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ চাকরিজীবী। এছাড়া এসব শাখা কমিটির আরো কয়েকজন প্রবাসী ও ব্যবসায়ী নেতৃত্বে রয়েছেন।দলীয় সূত্র জানা যায়, গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে সমর্থন দেওয়া হয় উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান সুমন ভূঁইয়াকে। সেখানে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হন উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রশিদ আকন্দ।অভিযোগ রয়েছে, দলবল নিয়ে নির্বাচনের দিন সুমন ভূঁইয়ার ওপর অতর্কিত হামলা চালায় মামুন। পরে মামুন নির্বাচিত হয়। সে সময় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলেও এখনও দলের পদ-পদবি নিয়ে দাঁড়িয়ে বেড়াচ্ছে ওই নেতা।পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা জানায়, আধিপত্য নিয়ে বেশ কয়েকবার ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়েছে। এসব ঘটনায় থানায় মামলাও হয়েছে। ২১ মে উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে প্রবাস ফেরত আবুল খায়েরের কাছ থেকে চাঁদার টাকা আনতে গিয়ে রামগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আরাফাত হোসেন সজল, উপজেলা ছাত্রলীগের সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক সজিব হোসেন ও কমিটির নির্বাহী সদস্য ফারুক হোসেন পুলিশের জালে ধরা পড়েছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক করপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, আমরা দ্রুত ছাত্রলীগের সম্মেলন চাই। ছাত্রলীগ এভাবে আর জিম্মি থাকতে পারে না বিবাহিত, ঠিকাদার, অছাত্র, ব্যবসায়ীদের কাছে। সম্মেলনে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র অনুসরণ করতে হবে। এতে প্রকৃত ছাত্ররা নেতৃত্বে আসলে সংগঠন শক্তিশালী হবে।পৌর আওয়ামী লীগের এক নেতা জানায়, ছাত্রলীগের হাতে গোনা দুই-একজন ছাড়া প্রায় সবাই টেন্ডারবাজি ও অপকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাঁদের কাছে ভালো কিছু আশা করা যায় না। ছাত্রনেতাদের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানমুখি হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।এ ব্যাপারে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সৈকত মাহমুদ শামছু দাবি করেন, রামগঞ্জে ছাত্রলীগ এক্যবদ্ধ। নেতাকর্মীরা সব আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ সময় ছাত্রলীগ নেতারা কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িত নয় বলেও দাবি তিনি।জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি চৌধুরী মাহমুদুন্নবী সোহেল বলেন, কেন্দ্র থেকে শীঘ্রই জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর রামগঞ্জে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। এতে গঠনতন্ত্র মোতাবেক প্রকৃত ছাত্ররাই নেতৃত্বের সুযোগ পাবে। কমিটিতে কোনো অছাত্রের ঠাঁই হবে না।কাজল কায়েস/এআরএ/আরআই