আকাশে চাঁদের হাসি, হালকা কুয়াশায় ভেজা জোছনার আলো। সারা রাত কেউ ঘুমায়নি। পূব আকাশে ভোরের পূর্ণিমা তিথির নতুন সূর্য ওঠার অপেক্ষা। উষালগ্নে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নর-নারীর ভিড়। পূণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে গোটা সমুদ্র সৈকত। আকাশে উড়ছে বাহারী রংঙের বেলুন।
বঙ্গোপসাগরের লোনা জলে নামে হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজারো নর-নারী। মানতকারীরা মাথার কেশ ন্যাড়াসহ প্রায়শ্চিত্ত ও পিণ্ডদান করেন। পূণ্যের আশায় বেলপাতা, ফুল, ধান, দূর্বা, হরিতকি, ডাব, কলা, তেল, সিঁদুর সমুদ্রের জলে অর্পণ করেন। তারা পূর্ণিমার মধ্যে উলুধ্বনি ও মন্ত্রপাঠ করে পুণ্যস্নানের মধ্য দিয়ে শেষ করেছেন এ বছরের রাসমেলা। এরপর ফিরে গেছেন নিজ নিজ গন্তব্যে।
এ বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় এক লাখ পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছে এমনটাই জানিয়েছেন রাসমেলা উদযাপন কমিটি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ডা. মো. মাছুমুর রহমান। এসময় পটুয়াখালী জেলা ও কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এরপর মূলমঞ্চে সারা রাত দেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী জীবনান্দন কানাই, তাপস মজুমদার, শিশির গানে গানে মাতিয়ে তোলেন দর্শনার্থীদের। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীরাও সুযোগ পান মঞ্চে গান পরিবেশনের। মন্দিরের সামনে শ্রী কৃষ্ণের নাম যজ্ঞ ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে রাত শেষ হয়।
প্রতি বছরের মতো এবারও পুণ্যস্নান উপলক্ষে সমুদ্রসৈকতে মেলা বসেছে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত মহামিলন মেলায় পরিণত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে কুয়াকাটার বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়। এছাড়া পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ছিল চোখে পড়ার মতো।
রাসমেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি ও কলাপাড়া পৌর মেয়র বিপুল হওলাদার জানান, প্রায় দুই শত বছর যাবত পূর্ণিমা তিথিতে এ রাসলীলা উৎসব ও মেলা চলে আসছে।
তিনি বলেন, দাপর যুগে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, হিংসা, হানাহানি দেখে দুষ্টের দমন ও সৃষ্টের লালনের জন্য স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নাম ধারণ করে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন।
কুয়াকাটা পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাবু অনন্ত কুমার মুখার্জী জানান, ব্যাপক নিরাপত্তা, উৎসাহ উদ্দীপনা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, রাতভর শ্রী কৃষ্ণের নাম যজ্ঞ ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অনুষ্ঠান গঙ্গাস্নান ও শ্রী কৃষ্ণের রাসলীলা উৎসব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, শনিবার সকালে পূর্ণিমা তিথি লাগার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার পুণ্যার্থী উলুধ্বনি দিতে দিতে একযোগে সমুদ্রে স্নানে ঝাঁপিয়ে পরেন। স্নান শেরে শ্রী শ্রী রাধা কৃষ্ণের যুগল দর্শন শেষে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীরা নিজ নিজ গন্তব্যে যেতে শুরু করেন। মেলায় বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৩ শতাধিক ভাসমান দোকানির রঙ বেরঙের বাহারি সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে ছিল।
অপরদিকে কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল সূত্রে জানা গেছে, এ বছর রাসমেলা ও পুণ্যস্নান উৎসবে আবাসিক হোটেলগুলোর কোনো কক্ষ খালি ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে ব্যাপক লোক সমাগম হয়েছে। অন্যান্য বারের চেয়ে এ বছর মেলায় বেচাকেনা খুবই ভাল হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
এদিকে রাস মেলা উপলক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনসার ভিডিপি, পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলে পর্যটন নগরী কুয়াকাটাকে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানভির রহমান বলেন, সব প্রস্তুতির পাশাপাশি রাস উৎসবে আগতদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়। কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই এবারের রাসমেলা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
টুরিস্ট পুলিশের কুয়াকাটা জোনের এএসপি মো. আ. করিম বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরাসহ নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ছিল। এ কারণে কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
এমএমজেড/এমএস