কুয়াকাটার সাগরপাড়ের শিশুরা ডিজিটাল জ্ঞানের ঢেউয়ে মেতে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার লতাচাপলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নয়জন শিক্ষক আন্তরিকতার সঙ্গে পড়াচ্ছে ৪৩০ জন কোমলমতী শিশু শিক্ষার্থীকে। খেলাধুলা হাসি আনন্দের মাঝে শিশুদের লেখাপড়ায় মনযোগী করার মধ্য দিয়ে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
শিশু শিক্ষার্থীদের আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত এবং ডিজিটাল পদ্ধতির সরঞ্জাম ব্যবহারে বিদ্যালয়টি ঈর্ষণীয় অবস্থানে পৌঁছেছে। ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের পড়ালেখায়। এসব শিশুদের অতিরিক্ত পাঠদানের জন্য রয়েছে বিশেষ কক্ষ। যথাযথ পরিকল্পনা, আধুনিক কলাকৌশলের ব্যবহার এবং প্রধান শিক্ষকের সুযোগ্য নেতৃত্বে শিক্ষকদের আন্তরিকতায় ইতোমধ্যে বরিশাল বিভাগে দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হয়েছে সাগরপাড়ের কুয়াকাটা লতাচাপলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এখানকার শিশুরা হাসতে হাসতে, খেলতে খেলতে চিনছে বর্ণমালা। শিখছে ছড়া-কবিতা আবৃত্তি নাচ-গান ও উপস্থাপনা। এখান থেকেই মজবুত হচ্ছে ভবিষ্যৎ জীবন কাঠামোর ভীত।
বিদ্যালয়ে ক্লাস শুরুর আগমুহূর্তে প্রতিদিন শিশুরা সুশৃঙ্খভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্সে আঙুলের ছাপ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছে। কোনো শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতিতে অভিভাবকের মোবাইল ফোনে পৌঁছে যাচ্ছে এসএমএস বার্তা। ১০টি সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে চলছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ।
ক্লাসে পাঠদান চলছে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে। কেন্দ্রীয় সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষিকা নজরদারি করছেন শ্রেণিকক্ষের পাঠদান। দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা। অনলাইনে বিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জানানো হচ্ছে পরীক্ষার ফলাফল। প্রযুক্তির এমন ব্যবহারে চলছে পটুয়াখালী জেলার সাগরপাড়ের এ বিদ্যালয়টির সকল কার্যক্রম। ২৭টি উদ্ভাবনী শিক্ষা পদ্ধতি বিদ্যালয়টিকে করে তুলেছে অনন্য। এরই মধ্যে ডিজিটাল মডেল স্কুল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিদ্যালয়ে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়ে শিক্ষার্থীদের কলরবে মুখরিত প্রাঙ্গণ। আনন্দে উচ্ছসিত শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত দোলনাসহ নানান খেলার উপকরণ নিয়ে। নজর কেড়ে নেয় দেয়ালের রংতুলির বর্ণিল চিত্রে। দেয়াল জুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল ইতিহাসসহ বর্তমান বাংলাদেশের উন্নয়নের নানান চিত্র এবং বিবরণ। দেশ-বিদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি, জীবনী, উক্তি ইত্যাদি।
কম্পিউটার ল্যাবে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ল্যাপটপ চালিয়ে জানার চেষ্টা করছে বিশ্বকে। রয়েছে ভৌগলিক কর্নার, প্রযুক্তি কর্নার, গ্রন্থাগার, স্পোর্টস কর্নার, বিজ্ঞানাগার, গণিত ল্যাব, স্বাস্থ্য কর্নার, ইতিহাস কর্নার, রক্তাক্ত প্রান্তর ও ভাস্কর্য, মিনি চিরিয়াখানা, মিনি শিশুপার্ক, কিড্স জোন, প্রত্যেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পরিচয় বোর্ড, সততা স্টোর, শিক্ষার্থীদের তৈরি দেয়ালিকা ও ম্যাগাজিন, বাংলাদেশ-বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি, এক নজরে বাংলাদেশ, মিড ডে মিল, মহানুভবতার জ্ঞান, শিক্ষার্থীদের বিতর্ক প্রতিযোগিতা কক্ষ, সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সকল তথ্য সংরক্ষণসহ ফুল, ফল, সবজির বাগান। রয়েছে অবিভাবকদের বিনোদন কক্ষসহ পাঠাগার। শতভাগ পাসের হারসহ ক্রীড়া-সংস্কৃতি প্রতিযোগিতায় জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ধারাবাহিক সাফল্য।
ইতোমধ্যে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে বাংলাদেশে চতুর্থ স্থান লাভ করেছে বিদ্যালয়টি। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি শ্রেণিকক্ষের সামনে নিরাপদ পানির ব্যবহারসহ স্বাস্থ্য সম্মত শৌচাগার। পাঠদানের ফাঁকে দেয়া হচ্ছে স্বাস্থ্য সচেতনতার নানান জ্ঞান। শিশু শ্রেণিতে পাঠদানের চেয়ে শিশুদের রাখা হয় খেলায় মশগুল। এর মধ্যেই চলে বর্ণমালা, গণনা ও ছড়া-কবিতা শেখানো। সকল ধর্মের বাণী পাঠ, জাতীয় সংগীত গাওয়া ছাড়াও নিজেকে একজন সুস্থ ধারার নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রতিদিন শপথ নেয় শিক্ষার্থীরা। শরীর চর্চা শেষে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যায় রণ সংগীতের তালে। শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির নিজস্ব অর্থায়নে স্কুল ব্যাগসহ বছরে দুই সেট নতুন ইউনিফর্ম দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বাবু অনন্ত মুর্খাজী বলেন, সাগরপাড়ের অনাগ্রসর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার জন্য ১৯৩৬ সালে আদিবাসী রাখাইন বাচিন তালুকদার প্রতিষ্ঠা করেন এ বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ে বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা যোগদান করার পর নতুনমাত্রা যোগ হয়। তিনি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া রোধ করে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাজমুস সাকিব খান কনা বলেন, একসময়ের এ অপরিপাটি বিদ্যালয়টিকে প্রথমে মডেল বিদ্যালয় উন্নীত করি। এখন রূপ দেয়া হয়েছে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার আলোয়। সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান। পাসের হার হয়েছে শতভাগ। গ্রামীণ জনপদের শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানের সুস্পষ্ট ধারণা। যা তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবনের পথ চলাকে সহজ করবে।
পটুয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসনে ইয়াসমিন করিমী বলেন, জেলার প্রথম মডেল বিদ্যালয় লতাচাপলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আদলে পর্যায়ক্রমে সকল বিদ্যালয়কে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এমএএস/এমএস