দেশজুড়ে

ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর দিয়ে বিপাকে শহিদুল

বিদেশে লোক পাঠানোয় জড়িত না থাকলেও গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম কেশালীডাঙ্গা গ্রামের নিরীহ কৃষক শহিদুল ইসলামের নামে মামলা করেছেন একই গ্রামের ভুট্টু মিয়া। এ ছাড়া শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনারের আরও দুইটি মামলা করেছেন দুই ব্যক্তি।

তবে শহিদুল ইসলাম আদম ব্যাপারী নয় এই মর্মে কামারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন।

পশ্চিম কেশালীডাঙ্গা, পূর্ব কেশালীডাঙ্গা ও কামারপাড়া স্টেশন বাজার ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহিদুল ইসলাম অত্যন্ত নিরীহ ও সাদাসিধে প্রকৃতির লোক। তিনি আদম ব্যবসা বা বিদেশে লোক পাঠানোয় জড়িত নয়। অন্যদিকে মামলার বাদী ভুট্টু মিয়া অত্যন্ত দুষ্টু প্রকৃতির লোক, দাদন ব্যবসায়ী, নারী লোভী ও বিভিন্ন গ্রামে জুয়ার আসর বসানোয় জড়িত। দ্বন্দ্ব সৃষ্টির আগে শহিদুল ইসলাম ও ভুট্টু মিয়ার মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। প্রতিদিন শহিদুল ইসলামের বাড়িতে যাতায়াত ছিল ভুট্টু মিয়ার।

মঙ্গলবার সরেজমিনে অনুসন্ধান ও পক্ষে-বিপক্ষে সংবাদ সম্মেলন থেকে জানা গেছে, এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী শহিদুল ইসলামের বড় মেয়েকে আগে থেকেই পছন্দ করতেন ভুট্টু মিয়া। তার স্বামী ঢাকায় আরেকটি বিয়ে করার কথা জানতে পারলে ২০১৫ সালে দুইপক্ষকে চাপ দিয়ে ডিভোর্স করিয়ে দেন ভুট্টু মিয়া। এরপরও শহিদুল ইসলামের বাড়িতে ভুট্টু মিয়ার যাতায়াত ছিল। পরে ফাঁদে ফেলতে ৪০ দিনের মাটি কাটার (কর্মসৃজন কর্মসূচি) কাজ দেয়ার কথা বলে কৌশলে ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর ভুট্টু মিয়া নিজের টাকায় কামারপাড়া অগ্রণী ব্যাংক শাখায় শহিদুল ইসলামের নামে ০২০০০১১২৬৪২৯৪ হিসাব নম্বরে একটি ব্যাংক একাউন্ট খুলে দেন।

পরে চেক বইয়ের ১০টি পাতায় টাকার ঘর ফাঁকা রেখে ভুট্টু মিয়া শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেন ও ব্যাংক একাউন্ট খোলার বিষয়টি কাউকে জানাতে নিষেধ করেন। চেক বইয়ে স্বাক্ষর নেয়ার পর একদিন শহিদুল ইসলামের বড় মেয়েকে কলেজে যাওয়ার পথে ভুট্টু মিয়া বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে শহিদুল ইসলাম ধরা আছে বলে জানান ভুট্টু মিয়া। তার কীভাবে ধরা আছে জানতে চাইলে শহিদুল ইসলাম ব্যাংকের ঘটনাটি খুলে বলেন।

এ ঘটনার পরে শহিদুল ইসলাম ভুট্টু মিয়ার কাছে চেক বইটি ফেরত চাইলে সেটি না দিয়ে ভুট্টু মিয়া বড় মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার জন্য শহিদুল ইসলামকে বলেন। শহিদুল ইসলাম বিয়েতে রাজি না হওয়ায় ভুট্টু মিয়া ক্ষেপে গিয়ে তাকে দেখে নেয়ার হুমকি দেন।

এরপরই শহিদুল ইসলামের স্বাক্ষর করা ওইসব চেকে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর ১০৬৫৪১৩ নম্বর চেকে নিজের নামে ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও ১০৬৫৪১৫ নম্বর চেকে পার্শ্ববর্তী সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত ধোপাডাঙ্গা গ্রামের আবু হানিফের নামে ১৭ ডিসেম্বর ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং উত্তর ধোপাডাঙ্গা গ্রামের মুকুল মিয়ার নামে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা লিখে রাখেন ভুট্টু মিয়া। পরে সেই চেকগুলো ব্যাংকে জমা দিলে টাকা না থাকায় শহিদুল ইসলামকে নোটিশ প্রদান করা হয়। পরে টাকা না পেয়ে চেক ডিজঅনারের মামলা করেন ওই তিন ব্যক্তি।

বর্তমানে ভুট্টু মিয়ার ঘরে যে স্ত্রী রয়েছেন তিনি ৫ম স্ত্রী। মোবাইলে প্রেমের সূত্র ধরে বিদেশ থেকে পাঠানো স্বামীর প্রায় ২৫ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে ভুট্টু মিয়াকে বিয়ে করেন তিনি। আগের চার স্ত্রীকে নির্যাতন করায় ভুট্টু মিয়ার সাথে তাদের ডিভোর্স হয়েছে। এরমধ্যে তৃতীয় স্ত্রীর ছোট বোন ভুট্টু মিয়ার বাড়িতে বেড়াতে আসলে তাকে অন্যত্র বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে জোড় করে বিয়ে করে বাড়িতে তোলেন। পরে দুই বোনকে মারধর ও নির্যাতন করায় তাদের ডিভোর্স হয়।

এদিকে শহিদুল ইসলাম যে আদম ব্যাপারী নন এজন্য কামারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ইউপি সদস্যরা একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। তাতে লেখা রয়েছে- শহিদুল ইসলাম একজন দিনমজুর। জানা মতে সে কোনো আদম ব্যাপারী নয় এবং বিদেশে লোক পাঠানোর ব্যাপারে কোনো প্রকার জড়িত নয়।

গত ৪ এপ্রিল ভুট্টু মিয়া ও আবু হানিফ এবং ৮ এপ্রিল শহিদুল ইসলাম স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে গাইবান্ধা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পশ্চিম কেশালীডাঙ্গা গ্রামের এক কৃষক (৫২) বলেন, শুধু এখন কেন শহিদুল ইসলাম কোনোকালেই বিদেশে লোক পাঠানোর ব্যাপারে জড়িত ছিলেন না।

শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি বিদেশে পাঠানোর কথা বলে কারও কাছে থেকে কোনো টাকা নেয়নি। ভুট্টু মিয়া মাটি কাটার কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে আমার নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেন। পরে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে আমাকে বিপদে ফেলেছেন।

ভুট্টু মিয়া বলেন, শহিদুল ইসলাম বিদেশে পাঠানোর কথা বলে আমার ও অন্য আরও দুইজনের কাছে থেকে ১৭ লাখ টাকা নেন। পরে বিদেশে পাঠাতে ব্যর্থ হলে তার প্রদান করা চেক ব্যাংকে জমা দেয়ার পর জানতে পারি সেই অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। পরে নোটিশ দেয়ার পরও টাকা না পাওয়ায় আমরা শহিদুল ইসলামের নামে মামলা দায়ের করি।

শহিদুল ইসলাম কখনোই আদম ব্যাপারী ছিলেন না জানিয়ে কামারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল আলম বলেন, শহিদুল ইসলাম সাদাসিধে প্রকৃতির লোক। এ ব্যাপারে মীমাংসার জন্য কোনোপক্ষই আমার কাছে আসেনি।

রওশন আলম পাপুল/আরএআর/এমএস