দেশজুড়ে

বাবা চলে গেছেন, কথা বলে কী হবে?

অাধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে সবুজ পাহাড়ে দিন দিন বাড়ছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। এ সংঘাতে একের পর এক ঝরছে তাজা প্রাণ। নিরীহ বাঙালিদের গুম-অপহরণ আর মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি স্বজাতি গ্রুপের একের পর এক প্রাণ কেড়ে নেয়া যেন নিয়মেই পরিণত হয়েছে সবুজ পাহাড়ে।

একের পর এক তাজা প্রাণ ঝরলেও এসব হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারগুলোকে। ফলে অনেকটা অধরাই থেকে যাচ্ছে পাহাড়ের এসব সন্ত্রাসী।

উত্তপ্ত পাহাড়ে ইউপিডিএফ’র সংগঠক মিটুন চাকমার ছেলের মতোই পরিণতি ভোগ করতে হলো জেএসএস (এমএন-লারমা) কেন্দ্রীয় নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমার মেয়ে শ্রেয়া চাকমা, জনসংহতি সিমতি (এমএন-লারমা) সমর্থিত যুব সমিতির মহালছড়ি উপজেলা সভাপতি সুজন চাকমার শিশুকন্যা প্রবারণা চাকমা ও জেএসএস (এমএন-লারমা) সমর্থিত কেন্দ্রীয় যুব সমিতির সদস্য সেতু দেওয়ানের শিশুপুত্র কৃতার্থ দেওয়ানকে।

সন্ত্রাসীদের বুলেট শুধুমাত্র মিঠুন-শক্তিমান-সুজন-সেতুদেরই জীবন কেড়ে নেয়নি। একইসঙ্গে পিতৃহীন করেছে তাদের অবুঝ সন্তানদের।

ইউপিডিএফের মূল সংগঠন ভেঙে ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর তপন জ্যোতি চাকমা প্রকাশ বর্মার নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’ নামে আরেক সংগঠন।

সংগঠনটি আত্মপ্রকাশের মাত্র ২০ দিনের মাথায় গত ৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৫ মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে ১৮ জনকে খুনসহ অনেককে অপহরণ করা হয়।

এসব ঘটনার পরপরই একপক্ষ অন্যপক্ষকে দায়ী করে গণমাধ্যমে দেয়া বিবৃতি আর হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল সংগঠনগুলো।

নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার ১৮ জনের অনেকেই ছিলেন পিতা বা স্বামী। ছিল তাদের পরিবার-পরিজন। এসব ব্যক্তির নির্মম পরিণতির পর সাধারণ নিয়মেই পিতৃহীন হয়েছে অনেকের সন্তান। বিধবার শাড়ি পরতে হয়েছে তাদের স্ত্রীদের। প্রবারণা, শ্রেয়া, কৃতার্থদের মতো অনেকেই পিতৃহীন হয়েছে। এসব পিতৃহীন সন্তানদের দায়িত্ব কে নেবে?।

রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী শ্রেয়া চাকমা বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই ডাক্তার হতে চেয়েছিল। হয়তো একদিন সে ডাক্তার হবেও। না হয় সন্ত্রাসীদের বুলেটের আঘাতে নিথর হওয়া বাবার শরীরে মতোই ফিকে হয়ে যাবে তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নও।

অসময়ে বাবাকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ শ্রেয়া চাকমা অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গেই বলেন, এটা নিয়ে কথা বলে কোনো লাভ নেই। যেটা যাওয়ার ছিল সেটা চলে গেছে। বাবা চলে গেছেন। এ নিয়ে কথা বলে কী হবে? কোনো লাভ হবে না।

খাগড়াছড়িতে নিহত ইউপিডিএফ’র তরুণ সংগঠক মিটুন চাকমার ছেলের মতোই সদ্য পিতৃহীন সুজনের শিশুকন্যা প্রবারণা আর সেতু লালের শিশুপুত্র কৃতার্থ কি জানে তাদেরকে নিয়ে বাবার কী স্বপ্ন ছিল। থাকলে সে স্বপ্ন কি আদৌ পূরণ হবে? নাকি শুধু স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যাবে। তারা কি পারবে পিতা হারানোর শোক ভুলে ঘুরে দাঁড়াতে?।

এ সংঘাত শুধুই কী আধিপত্য বিস্তারের লড়াই নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে তা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে পাহাড়জুড়ে। সবার প্রশ্ন, পাহাড়ে কবে বন্ধ হবে এমন হত্যাযজ্ঞ? নাকি এই লড়াইয়ে তাজা প্রাণের রক্তে লাল হবে সুবজ পাহাড়? একের পর এক অবুঝ সন্তান হবে পিতৃহীন?।

মুজিবুর রহমান ভুইয়া/এএম/আরআইপি