জলবায়ু পরিবর্তন হালের আলোচিত ইস্যু। এর প্রভাব পড়েছে রাজশাহীর ঐতিহ্য আমে। দিন দিন কমছে ফলের রাজার গুণগত মান। বাড়ছে রোগ-বালাইয়ের প্রকোপ। গবেষকরা বলছে, জলবায়ুর বৈরিতা নিয়েই যুগযুগ ধরে অঞ্চলজুড়ে ফলছে সুস্বাদু আম। আর বরাবরই সংকট উৎরে দিচ্ছে উন্নত জাত ও আধুনিক চাষের কলাকৌশল।
বেধে দেয়া সময়সীমা অনুযায়ী, এ বছর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে পাকা আম উঠেছে গত ২০ মে থেকে। এ দিন থেকে নামানো শুরু দেশি গুটি ও গোপালভোগ জাতের আম। এরই মধ্যে গুটি জাতের আম পাকলেও পুরোদমে পাকেনি গোপালভোগ। গাছে গাছে এখনও ঝুলছে অপরিপক্ক আম। গোপালভোগ পাকতে আরও সপ্তাহ খানেক লাগবে। ফলে অন্যান্য জাতের আম পাকাতেও বিলম্বিত হবার শঙ্কায় চাষিরা।
কৃষি কর্মকর্তা ও ফল গবেষকরা বলছেন, পাল্টে যাওয়া আবহাওয়ায় কারণেই ফল পাকায় বিলম্বিত হচ্ছে। সাধারণ ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে তাপমাত্রা থাকলে আমপাকা তরান্বিত হয়। মাঝে মধ্যেই বৃষ্টি নামায় কমে আসছে তাপমাত্রা। আর তাতেই প্রবলম্বিত হচ্ছে আমের ‘ফলক্রম’।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানায়, গত ১৬-২২ জুন পর্যন্ত তাপমাত্রার পারদ ওঠানামা করছে ২৯-৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই। এ কয়দিন বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩২ মিলিমিটার। আর ঢাকা আবহাওয়া অফিস তিন মাসের পূর্বাভাসে বলছে, চলতি মে মাসে রাজশাহী অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে ১৯০-২৩৫ মিলিমিটার। তবে এ মাসেই নেমে আসবে তীব্র তাপপ্রবাহ। অন্তত দুই থেকে তিন দিন ধরে বিরাজ করতে পারে এ তাপপ্রবাহ। ওই সময় তাপমাত্রার হবে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর জুন মাস থেকেই নামবে বর্ষা। এ সময় ২৭৫-৩৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হবার কথা। এর মধ্যেই জুনের প্রথম দিনই বাজারে নামবে হিমসাগর, খিরসাপাত ও লক্ষণভোগ আম। আর ল্যাংড়া জাতের আম নামবে ৬ জুন। এছাড়া ১৬ জুন নামবে আম্রপালি ও ফজলি। মৌসুমের সব শেষ আম আশ্বিনা নামবে ১ জুলাই থেকে। তবে বৈরী আবহাওয়া কারণে এসব জাতের আম পাকাও বিলম্বিত হতে পারে।
আম পাকা পুরোপুরো তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী ফল গবেষনা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জিএম মোরশেদুল বারি ডলার। তিনি বলেন, আমচাষের জন্য সাধারণ ২০-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন। তবে আম পাকার সময় তাপমাত্রা থাকতে হবে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে। তা না হলে আম পাকা বিলম্বিত হবে। এখন সেটিই ঘটছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল।
এই গবেষক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত বণ্টন ভেঙে গেছে। আবার অতিবৃষ্টি এবং টানা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। প্রলম্বিত হচ্ছে বর্ষাকাল। এটি আম চাষের জন্য অনুপযোগী।
তিনি বলেন, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার হেরফেরে রোগের সংবেদনশীলতা বেড়েছে। টানা বৃষ্টিপাত ও ভ্যাপসা গরমে এখন আমে ব্যাপক আক্রমন হচ্ছে মাছিপোকার। এটি চলে গেছে এখন রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে। ফলে ভরসা এখন ফেরোমন ট্র্যাপ এবং ফ্রুটব্যাগ।
এবারই প্রথম দেখা দিয়েছে তারকাকার ব্যাক্টেরিয়াল স্পট। এ বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে নতুন এ ব্যাক্টেরিয়াল স্পট দেখা গেছে। প্রকট হচ্ছে অন্যান্য নিয়মিত রোগ-বালাই। এ সব মোকাবেলায় নিরন্তর গবেষণা চলছে ।
জেলার তানোরের পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম। পৈত্রিক ১১ বিঘার জমিতে আম বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি। তিনি বলেন, তার বাগানজুড়ে থোকায় থোকায় আম ঝুলছে। কিন্তু অধিকাংশ আম গাছেই মাছিপোকার আক্রমণ। এতে নষ্ট হচ্ছে আম। কৃষি দফতরের পরামর্শে রাসায়নিক প্রয়োগেও কাজ হচ্ছে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণা কেন্দ্রের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সাধারণত ৪০ দিনের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে আমের গুটি ঝরে যায়। এরপরই ফ্রুটব্যাগিং করতে হয় আম। ৫০ থেকে ৬০ দিন আম ফ্রুটব্যাগে থাকে। এটি আমকে নানান বালাই থেকে সুরক্ষা দেয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরেই দেশে আমের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয় সাড়ে ১২ লাখ টন। তবে চলতি অর্থবছর তা ছাড়িয়ে যাবে ১৪ লাখ টন। এর মধ্যে রাজশাহীতেই তিন লাখ টনের উপর উৎপাদন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ফেরদৌস সিদ্দিকী/আরএ/এমএস