একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে শরীয়তপুর আওয়ামী লীগের মধ্যে মনোনয়নের লড়াই ততই জমে উঠছে। ঢাকার অদূরে পদ্মা-মেঘনা নদী বেষ্টিত শরীয়তপুর সদর এবং জাজিরা উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে শরীয়তপুর-১ আসন। অনেক আগে থেকেই বেশ জোরেসোরে এ আসনে নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে। আর এদিকে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা শুরু করতে গিয়ে তৃণমূলের শাসক দলের নেতাদের মধ্যে চলছে অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ।
সুবিধা বঞ্চিত নেতারা বলছেন, শরীয়তপুর আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকা হওয়া সত্ত্বেও উন্নয়নের তেমন কোনো ছোঁয়া লাগেনি। জেলাটি রাজধানীর অতি কাছাকাছি হলেও সেই অনুযায়ী বিদ্যুতায়ন ও রাস্তাঘাটের দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি। তবে পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হওয়ায় নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে শরীয়তপুরবাসী। আর সেই স্বপ্নকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করছে সরকার দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীরা। আবার অনেকের ধারণা, পদ্মা সেতুটি হয়ে গেলে এ জেলার চিত্র পাল্টে যাবে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছে। আর এদিকে অভ্যন্তরিণ কোন্দলের কারণে বিএনপি আজ বহু দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এ কারণে বিএনপির কোনো দলকেই মাঠে পাওয়া যাচ্ছে না।
জানা যায়, জেলার সদর ও জাজিরা দুটি উপজেলায় ২টি পৌরসভা এবং ২৩টি ইউনিয়ন নিয়ে শরীয়তপুর-১ আসন গঠিত। এ আসনে বরাবরই আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হয়ে আসছে। বিশেষ করে নব্বইয়ের পর এ আসনে অন্য কোনো দলের প্রার্থী নির্বাচিত হয়নি।
গত কয়েক বছর ধরে শরীয়তপুর সদর থেকে আওয়ামী লীগ কাউকে মনোনয়ন না দেয়ায় এ নিয়ে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ আসনে আওয়ামী লীগ কখনও জাজিরা আবার কখনও ডামুড্যা থেকে প্রার্থী ধার করে এনে মনোনয়ন দিয়েছে। আসনটির বর্তমান এমপি হলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বি.এম মোজাম্মেল হক।
২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি এমপি হন। আগামী নির্বাচনে তিনি দলের একজন শক্তিশালী প্রার্থী। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ছাড়াও এ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য ইকবাল হোসেন অপু, শরীয়তপুর পৌরসভার মেয়র সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা মো. রফিকুল ইসলাম কোতোয়াল, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি এবং বিশিষ্ট শিল্পপতি আলহাজ মোবারক আলী সিকদার, শরীয়তপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল হাসেম তপাদার।
এদিকে বিএনপির মনোনয়ন দৌঁড়ে এগিয়ে রয়েছেন সাবেক এমপি, পৌরসভার সাবেক মেয়র এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালু, জেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক মিন্টু সওদাগর।
এছাড়া জাতীয় পার্টি জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান মাসুদ, জাসদের (ইনু) কেন্দ্রীয় কমিটির স্থানীয় বিষয়ক সম্পাদক এবং জেলা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক।
নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রয়াত কে.এম হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গজেব এমপি হন। পরে ১৯৯৬ সালে এমপি হন প্রয়াত আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আব্দুর রাজ্জাক।
২০০১ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী প্রয়াত আওরঙ্গজেব বিজয়ী হন। ২০০৮ সাল থেকে এ আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক এম.পি নির্বাচিত হন।
নেতাকর্মীরা জানায়, এ আসনে ব্যক্তি বড় কথা নয়। এখানে মূল ব্যাপার হলো মার্কা। যিনি নৌকা মার্কা পাবেন তিনিই বিজয়ী হবেন। বর্তমানে এ আসনে আওয়ামী লীগ তিনটি ভাগে বিভক্ত। একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান এমপি বিএম মোজাম্মেল হক। একটি পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ইকবাল হোসেন অপু। অন্যটির নেতৃত্বে রয়েছেন জাজিরা উপজেলা চেয়ারম্যান মোবারক আলী সিকদার।
তারা তিনজনই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরীয়তপুর-১ আসন থেকে মনোনয়ন লাভের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। নির্বাচনকে সামনে রেখে বি.এম মোজাম্মেল হক ঘন ঘন এলাকায় আসছেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসছেন এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। সেখানে ভোটারদের সামনে সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন।
অপর দিকে শরীয়তপুর জেলায় বিএনপির তেমন কোনো দৃশ্যমান সাংগঠনিক কর্মসূচি চোখে পড়েনি। বিএনপি নেতারা বলছেন, পুলিশ বিএনপিকে কোনো কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না।
শরীয়তপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর মৃধা বলেন, শরীয়তপুর-১ আসনে ব্যক্তি ইমেজে ভোট হয় না। মার্কা দেখে মানুষ ভোট দেন। ৯০ দশকের পর সদর উপজেলার লোক এমপি না হওয়ায় জেলা সদরের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও যোগাযোগের তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি।
জাসদের মনোনয়ন প্রত্যাশী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক বলেন, আমি দলের পক্ষে এ আসনে মনোনয়ন চাই। মনোনয়ন পেলে নির্বাচন করবো।
জাতীয় পার্টি (এরশাদ) মনোনয়ন প্রত্যাশী অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করবে। এজন্য পার্টির চেয়ারম্যান এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাদের কাজ করতে বলেছেন। আমরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি।
শরীয়তপুর পৌরসভার মেয়র সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা মো. রফিকুল ইসলাম কোতোয়াল বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি আমাকে মনোনয়ন দেন তাহলে আমি বিপুল ভোটে বিজয়ী হব। জনগণের প্রতি আমার আস্থা আছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালু বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচন হতে হবে। এই সরকারের আমলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে মনে হয় না। যদি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে বিএনপির আমি একজন প্রার্থী। আমি দলের দুর্দিনে পাশে ছিলাম, বর্তমানেও আছি, ভবিষ্যতেও থাকবো। সর্বদিক চিন্তা করে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শরীয়তপুর-১ আসনের সাংসদ বি এম মোজাম্মেল হক বলেন, শরীয়তপুরের মাটি, আওয়ামী লীগের ঘাটি। আওয়ামী লীগ যাকে মনোনয়ন দেবে, তাকে নিয়েই কাজ করতে চাই। তবে এবারও মনোনয়ন নিয়ে শতভাগ আশাবাদী তিনি।
ছগির হোসেন/এমএএস/জেআইএম